মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নির্বাচনের আগে খুন ও হামলার রাজনীতি : গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত
তাসনিয়া তাবাচ্ছুম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৮ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নির্বাচন গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসব বলা যায়। জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকার প্রয়োগ করবে—এটাই হওয়া উচিত নির্বাচনি সময়ের প্রধান চিত্র। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন এক দৃশ্য তুলে ধরছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীরা প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ প্রচারণার সময়ই দেশে ঘটছে খুন ও হামলার ঘটনা। সংসদ পদপ্রার্থীরা, দলের নেতাকর্মীরা এমনকি সমর্থকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজনের প্রাণও চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথে এগোচ্ছি, নাকি সহিংসতার রাজনীতিকে আরও একবার বৈধতা দিতে যাচ্ছি?

নির্বাচনের আগে এমন ধরনের সহিংসতা নতুন নয় এদেশে। অতীতেও বহুবার দেখা গিয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধিতা সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে। মতের অমিলকে মোকাবিলা করা হয়েছে লাঠি, ছুরি, ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হয়। নির্বাচনসংক্রান্ত ঘটনায় ২০০১ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত কমপক্ষে ২১৭ জন নিহত হয়েছে। নির্বাচনের দিন কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়। এ নির্বাচনে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় ২৬ জন প্রাণ হারায়। ভোটের আগে ১৫ জন, ভোটের দিন ৫ জন আর ভোটের পরে ৬ জন নিহত হন। ১৯৯৬ এর ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬৬ জন এবং ভোটের দিন ১০ জন নিহত হয়। আর ভোটের পর নিহত হয় প্রায় ৪৮ জন। এবারের নির্বাচনি প্রচারণাও সেই পুরোনো সংস্কৃতির বাইরে যেতে পারছে না। 

গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে আহত জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা মারা গেছেন। গত বুধবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বসার আসন নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। নিহত মাওলানা রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি। এ ঘটনায় বিএনপি এবং জামায়েত ইসলামির আর অন্তত ৩০ জন আহত। বিএনপির দুজন কর্মীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এসব দেখে প্রশ্ন ওঠে—২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের রক্তের বিনিময়েও কি তবে কোনো পরিবর্তন আসবে না এদেশের রাজনীতিতে? আবারও রাজনৈতিক মাঠে যুক্তির বদলে শক্তির প্রদর্শন, কর্মসূচির বদলে হামলার রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। এটাই যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক চিত্র হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সহিংসতার শিকার হচ্ছেন দলগুলোর সাধারণ কর্মী ও সমর্থকরা। তারা কেউ নীতিনির্ধারক নন, কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। তবুও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি হিসেবে তাদের জীবন ঝরে যাচ্ছে। এমনকি নারী নেতাকর্মীরাও হামলার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এতে শুধু রাজনৈতিক পরিবেশই নষ্ট হচ্ছে না, সামাজিক নিরাপত্তাবোধও ভেঙে পড়ছে। সাধারণ মানুষ ভয় পাচ্ছে সভা-সমাবেশে যেতে, প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে এবং মতপ্রকাশ করতে।

নির্বাচন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিযোগিতা হবে নীতির, কর্মসূচির ও আদর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি হয় ভয় দেখানো, হামলা চালানো ও প্রতিপক্ষকে দমন করার মাধ্যমে তখন আর সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না—তা হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের লড়াই। খুন ও হামলার মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী জয়ী হলেও তা কখনোই প্রকৃত বিজয় হতে পারে না। কারও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্জিত ক্ষমতা কখনোই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ঘটনার পর মামলা করলেই হবে না। প্রয়োজন আগাম প্রতিরোধ, কার্যকর নজরদারি এবং দোষীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। অপরাধীরা যদি দলীয় ছত্রছায়ায় রক্ষা পেয়ে যায়, তবে সেটি শুধু সহিংসতাকেই উৎসাহিত করবে না বরং ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের সৃষ্টি করবে। 

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও কোনো অংশে কম নয়। দলীয় নেতারা মুখে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তবে তাদের কর্মীরাই সহিংসতায় জড়াচ্ছে। দলীয় নেতৃত্ব যদি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তবে তাদের উচিত নিজ নিজ কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া। অন্যথায় শান্তির আহ্বান কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। 

নির্বাচনের আগে খুন ও হামলার রাজনীতি মূলত গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেতই বটে। এটি জানান দেয়, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো সহনশীলতা ও যুক্তির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। মতভিন্নতা মানেই শত্রুতা—এ ধারণা ভাঙতে না পারলে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ভোটাধিকারও কেবল ব্যালট বাক্স অবধি সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তব জীবনে নাগরিকরা থাকবে আতঙ্কের মধ্যে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—সহিংসতার রাজনীতিকে বিদায় জানানো। লক্ষ্য রাখতে হবে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্ত যেন বৃথা হয়ে না যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। নচেৎ আমরা এমন এক নির্বাচনের দিকে এগোব, যেখানে ব্যালটের চেয়ে রক্তের হিসাবই বেশি হবে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এ খুন ও হামলার রাজনীতির বিরুদ্ধে এখনই স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  খুন ও হামলার রাজনীতি   নির্বাচন   গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close