সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
জীবনানন্দ
শেষ দৃশ্য
তাইবা তুলবি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৩৭ এএম আপডেট: ৩০.০১.২০২৬ ১০:২১ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

চাঁদ থেকে ক্রমশ যে ক্ষীণ আলো আমার বুকে নেমে আসছিল, আমি সে আলোয় ধীরে ধীরে পথ চলতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে চেতনার হাওয়ায় একটু পর পর আমি জেগে জেগে উঠছি। এ দীর্ঘ পথ কোথায় থামবে তো জানি না। শুধু জানি জেগে অথবা ঘুমিয়ে... দু’ভাবেই আমি হাঁটতাম।

এটা সত্যি। কারণ জেগে উঠে সর্বদা অন্য কোথাও নিজেকে খুঁজে পেয়েছি আমি। নির্দিষ্ট স্থানে খুঁজে পাওয়া বললে ভুল হবে। কারণ বিস্তর সীমানা, আমি আমার পেছনে চলে যেতে দেখতে পেতাম- পাহাড়, মাঠ, ঝরনা, মেঘ, হ্রদ, বৃক্ষ, সমুদ্র....

সে যাহোক একই জায়গায় কেউ আমাকে কখনো দ্বিতীয়বার দেখবে এমন আশা করা যায় না। কক্ষণো না, কোনোদিন না। আমি নিজে আজ অবদি এক দৃশ্য দ্বিতীয়বার দেখেছি, এমনটা হয়নি। এখানে প্রত্যেকটা দৃশ্য- আমার দেখা শেষ দৃশ্য ছিল। শুধু পাহাড়, চাঁদ, ঝরনা, মেঘ, হ্রদ, সমুদ্র, তারা, আর বিশেষ কিছু নির্জীব অবয়ব বারবার দেখা হতো। তাই হয়তো এসব কিছুকে মানুষ নিজেদের বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে। বন্ধু... যাদের সাথে আমাদের বারবার দেখা হয়।

মৃদু হাঁটার গতিতে আমি এ পথে যা কিছু পর্যবেক্ষণ করি- নক্ষত্র, চাঁদ, সুবিশাল আকাশ। আচ্ছা, আমরা কী নিছকই মহাবিশ্বের বিনোদন। আমাদের দেখে ওরা কী খুব খুশি হচ্ছে? নাকি মহাবিশ্ব আমাদের বিনোদন? কিন্তু সেটা কী করে হতে পারে? আনন্দ তো নেই। রহস্য, ভয় ও নিঃসঙ্গতার ভেতরে কেউ কিভাবে আনন্দ করবে? সে যাহোক, এখানে যা কিছু বারবার দেখা হয়।

ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ


কেবল মানুষগুলোকে শেষবার দেখা হয়। আমরা সকলে নক্ষত্রের সাথে সংযুক্ত ছিলাম। পরোক্ষ সংযুক্তি নিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হতো। মানুষকে খুঁজে পাওয়ার কোনো দৃশ্য ছিল না। প্রত্যেকে একই আকাশের নিচে অথচ যার যার গ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আরও কিছু বিশেষ সূত্র এখানে লক্ষণীয়। প্রত্যেকবার পুরোপুরি নতুন কিছু এ পথে অপেক্ষা করে যা এ চোখ কখনো দ্যাখেনি বা এ মন কখনো বোঝেনি। নিজের পাঁচ মন মাথাটাকে বহন করে আমি যেখানেই পৌঁছে যেতাম- ক্ষতিগ্রস্ত হতাম।  

এখন রাত আটটা বেজে আট। পথে প্রান্তরে নিজের গল্পটা বলছি আমি। ঐ যে পাহাড়, চাঁদ, ঝরনা, মেঘ, হ্রদ, সমুদ্র, তারা...ওদের কেউ কেউ এখন এখানে উপস্থিত আছে। আপনি তাদের একজন হলে হয়তো গল্পটা শুনতে পাবেন। আমার আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। আর যদি আপনি মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে হয়তো এটা প্রশ্ন যে, আমি মানুষ কিনা। আর যদি কোনো কারণে উভয়েই মানুষ হয়ে থাকি, তবে আমাকে শেষবার শুনতে পাচ্ছেন কিনা। আড়াল থেকে, চুপটি করে। আমারই মতন হাঁটতে হাঁটতে। যদি তাই হয়, যতই লুকিয়ে শুনুন না কেন, এটা শেষ দৃশ্য হবে।

সে যাহোক...নতুন শীত শীত গন্ধে আমার আজ দু’জন বন্ধুকে দেখবার তীব্র ইচ্ছে হচ্ছে- সরব আর সন্ধ্যা। যাদের আমি মাত্র একবার দেখতে পেয়েছিলাম.... শেষবার। আমি জানি, আমি কাউকে দেখতে পাব না। এখানে সব দৃশ্য শেষ দৃশ্য। লক্ষ কোটি মাইল দূরে বলে হয়ত বুঝতে পারি না- তারাগুলোও নতুন। দেবতাদের অধিকারে থাকা কিছু বিশেষ তারা ছাড়া, পুরোনো একটিও নেই। ঝরনা, নদী, সমুদ্রের জল নতুন। গাছের পাতাগুলো নতুন। পর্বতে পড়ন্ত বরফ ধুলো নতুন। এমনকি আকাশও নতুন।

চলতে চলতে ভাবি, পৃথিবী তো আমার হয়ে যথেষ্ট দৌড়ে চলেছে। প্রায় সাত লক্ষ বিশ হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। সে তো যাচ্ছেই। আমার তার পিঠের উপর এত দৌড়ে কি কাজ? আমি কেন এভাবে দৌড়ে যাচ্ছি? কোথায় যাব?

দীর্ঘশ্বাস! আমরাই বোধহয় ওদের বিনোদন। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ কি করে হতে পারে! কক্ষণো নাহ্! আমাদের জন্য কিছুই রাখা হয়নি এখানে। পৃথিবীতে একজন মানুষের জন্য, একজন মানুষ পর্যন্ত রাখা হয়নি। মহাবিশ্ব তো দূরের ব্যাপার!

আমার ভালোবাসা যাকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসলেও দ্বিতীয়বার দেখতে পাইনি, আমার স্নেহময়ী মা, ভাই আর যে ব্যক্তিটা নয় বছর আগে আমাকে খুব হাসান হাসিয়েছিল, খুব মনে পড়ছে ওদের। কি মনে করে, আমি থেমে গেলাম।

সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমার হৃৎপিণ্ড হঠাৎ শরীরের ভেতরে দুলে উঠল। কিছুসময় আমি উপরে তাকিয়ে রইলাম। স্থির সবকিছু আমাকে বিস্মিত করল। আমি স্থির হইনি, কোনোদিন। কখনোই থেমে যায়নি। ভারি চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি আজ। একটা ফেনায়িত ঝরনার ঝরঝর শব্দ... এই ছন্দ আমাকে আমার গতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। পুনরায় ভীত ও সতর্ক হচ্ছি আমি। উদ্বিগ্ন হচ্ছি। এত রহস্যর মাঝে আমরা কিভাবে আনন্দ করব? আমাদের উদ্বিগ্ন থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়। বরং আনন্দ করাটাই এখানে অদ্ভুত দেখাবে... সে যাহোক নিরন্তর প্রবাহে ওটা আমাকে একটা স্থির দৃশ্য উপভোগ করতে বাধা সৃষ্টি করছে স্রেফ্। মহাবিশ্ব আসলে চায় না আমরা বোকার মতন আনন্দ করি। তাই তো প্রত্যেকটা মানুষ এখানে নির্ভেজাল দুঃখী। বরং সুখে ভেজাল থাকতে পারে...  সময় যেতে লাগলে, আমি পাঁচ মন থেকে সাড়ে সাতমন হয়ে উঠলাম। আমি সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝরনা অদ্ভুত সুন্দর; স্থির দাঁড়িয়ে এভাবে কখনো দেখা হয়ে ওঠেনি। ঝরনার সৌন্দর্য আর গড়িয়ে যাওয়া স্রোত দেখতে দেখতে আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে কল্পনা করি। যদিও তার সাথে এই ঝরনার দৃশ্যের কোনো মিল পাওয়া যায় না। সে তো মানুষ। হঠাৎ তাকে দেখার তীব্র যাতনায় আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘এ পথ আমি ঘৃণা করি। হে ঈশ্বর! কেন আমাকে না চাইতেও হাঁটতে হবে। আমি কেন থেমে যেতে পারি না?’

রাত দশটা বেজে একুশ। আমি দাঁড়িয়ে আছি। এটা নিশ্চিত সাহসিকতা। এর আগে আমি এ ধরনের কাজ করার চেষ্টা করিনি; কোনোদিন না। আমার পূর্বে এমনটা কেউ করেছে কিনা জানি না... আমি আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রোমে ঠান্ডা শিহরণ টের পাচ্ছি। পেছনের প্রত্যেকটা পথ কালো কালো। কিচ্ছু নেই সেই দিকে। সামনে স্পষ্ট পাথর বাঁধানো পথ। হাঁটলে আরও অনেকদূর যাওয়া সম্ভব। কেন যেতে হবে? যেতে যদি না চাই? আমি কেন বারবার একই দৃশ্য দেখতে পারি না? সেসব দৃশ্যে উপস্থিত থাকতে পারি না? সেসব দৃশ্যে উপস্থিত থাকতে পারি না, যেসব দৃশ্যে আমি থাকতে চাই! এটা কি পদার্থবিজ্ঞানকে না জানার অপরাধ? আদিম আর অনুন্নত পর্যায়ে পড়ে আছি এখনো? সে যাহোক...

‘কেউ কি আছে?’ আমি পাহাড়ের দিকে মুখ করে ডেকে উঠলাম। ঝোপা মতো গাছের মাথাগুলো থেকে কয়েকটা কাক বেরিয়ে এলোমেলো উড়ে গেল এদিকে সেদিকে। আমার মাথার ওজন সম্ভবত এখন নয় মনের কাছাকাছি। ভার সামলাতে না পেরে, আমি ঝরনার ধারে মাথা নুয়ে বসে পড়লাম। ছিঁটে ছিঁটে জল শিল পাথর হয়ে, আমার শরীর ভেজাতে লাগল।
একটা ছায়া নেচে উঠল আমার মাথার দিকে। আমি ঝুঁকে আছি বলে দেখতে পেলাম না। রাত এগারোটা বেজে তেপ্পান্ন। নাহ্, আমি ঘড়ি দেখছি না। এতক্ষণ ধরে ঘড়ি দেখে সময় বলিনি। হৃৎপিণ্ড দিয়ে আমি সময় পরিমাপ পদ্ধতি শিখেছি; একা একা। এ আমার বিশেষ গুণ। অনুমান এতটাই সঠিক থাকে যে, সেটা একেবারে আমার শরীরের সাথে ফিটফাট। হা. হা। এই মুহূর্তে আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। মাথাটা মাটি ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তথ্যটা বেশ আনন্দের, তাই না? দুঃখের ব্যাপার কেউ জানবে না; আমার কীর্তিকলাপ সম্পর্কে। যেহেতু পথ হয়ে পথ পেরোতে হয়। আর আমার এই পথে কেউ কখনো আসবে না।

এ পথ শুধু আমার। যে পথের প্রত্যেকটা দৃশ্য শেষ দৃশ্য। 

একটা ছায়া আবারও কেঁপে উঠল। ইঙ্গিত পেয়ে, এবার আমি সাহায্যে চাইলাম। যদিও গল্প ছাড়া পথ চলতে আমাকে কেউ সাহায্য করেনি। মাথা নোয়ানো অবস্থায় নিজের শরীর দেখতে পাচ্ছি কেবল। একটা মেফ্লাই বসেছে আমার বুকের উপরে। উল্টো অবস্থাতেই আরাম করছে। এই মুহূর্তে একটা বিষয় আমি অনুধাবন করতে পারছি, আমরাই মহাবিশ্বকে বিনোদন দিচ্ছি, নিঃসন্দেহে। সে যা কিছু আমাদেরকে দিয়ে ভাবিয়ে নিচ্ছে তার উপকারের জন্য। আমি জানি না, শেষদৃশ্যে সে আমাদের দিয়ে কোন কাজটা করিয়ে নেবে। কিসের এত প্রস্তুতি? কিসের এত প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড! তার উদ্দেশ্য তো কেবল আমার এই দশ মণ মাথাটা ব্যবহার করা। একটা মেফ্লাই যেমন কয়েক ঘণ্টা জীবিত থেকে নিজেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। ন্যূনতম সময়ে একটা গোটা জীবনের ফাঁদে ফুরফুর করে। তেমনিই...

দীর্ঘশ্বাস! সবাই ব্যবহৃত হচ্ছি। ‘তোর আমার মাথাটা কেবল উদ্দেশ্যের জন্যই ব্যবহৃত হচ্ছে, মেফ্লাই। তোর আমার উদ্দেশ্য বলে যা আমরা দু’জন ভাবছি। সেসব আসলে আমাদেরই নয়। না হয় এত দুঃখ কী আমাদের হতো! উদ্দেশ্য যদি আমাদের হতো, আমরা কী এতটা নিঃসঙ্গ হতাম? আমরা আমাদের জন্যই যদি হতাম, দুঃখকে কি আমরা নিজেদের জন্য বেছে নিতাম? ফাংশানাইজড্ করতাম? দেখ আমার মাথাটা। মগজের সাথে সাথে দুঃখটাও যে বড় হয়েছে। আমরা কি নিজেদের জন্য তা করতাম? মেফ্লাই?’

মেফ্লাই কোনো জবাব দিল না। সে যাহোক, কেউ সাহায্যের জন্য থাকবে কিনা! আমি সাহায্য চাইলাম ‘আমার মাথাটা কেউ তুলে দিতে সাহায্য করো। আমি দাঁড়াতে পারছি না।’

কিন্তু কারো নিশ্বাস পেলাম না। শব্দ নেই কোথাও। সম্ভবত ওটা আমার মাথা আর খাড়া নাকের ছায়া ছিল। যাকে মানুষ মনে করেছি। আমি আর কাউকে ডাকলাম না। সময় পেরোলে, আমি আরও নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। মাথাটা সম্ভবত বারো মনের কাছাকাছি। রাত বারোটা বেজে শূন্য। আমার বলার মতন কোনো গল্প নেই। আমি একটা নিরিবিলি পথে পরিণত হয়েছি।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  শেষ দৃশ্য   তাইবা তুলবি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close