কক্সবাজারের টেকনাফ এখন যেন এক আতঙ্কের জনপদ। একদিকে নাফ নদীর ওপার থেকে আসা আরাকান আর্মির গোলার শব্দ, আর অন্যদিকে ঘরের পাশের পাহাড়ে ওঁৎ পেতে থাকা অপহরণ চক্র। বিশেষ করে হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। কৃষি কিংবা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য পাহাড়ে গেলেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি হতে হচ্ছে সাধারণ কৃষকে।
গত মঙ্গলবার মিনাবাজার থেকে নিখোঁজ হওয়া ছয় কৃষকের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর টেকনাফে অপহৃত হন জাদিমুরায় এক বনকর্মীসহ বন বিভাগের অধীনে কর্মরত ১৯ জন শ্রমিক এবং এক দোকানদার ও চালকসহ ৮ যাত্রী। আর্থিকভাবে সচ্ছল বা প্রবাসে আত্মীয়-স্বজন রয়েছে এমন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। দেশে বইছে নির্বাচনি হাওয়া প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনি কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত আর ঠিক এ সময় টেকনাফের মানুষজনের দিন কাটছে আতঙ্কে।
বিগত এক বছরে টেকনাফে প্রায় সাড়ে তিনশ মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকে এ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী দালালচক্র ও ১০টিরও বেশি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মিলে গড়ে তুলেছে এই ‘অপহরণ বাণিজ্য’। পাহাড়ের দুর্গমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা দিনের পর দিন এই অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের ভাষ্যমতে, পুলিশকে জানালে মুক্তিপণের অঙ্ক বেড়ে যায় কিংবা নেমে আসে হত্যার হুমকি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগোচরেই লাখ লাখ টাকা দিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে অপহৃতদের। আর যারা টাকা দিতে পারছেন না, তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সাগরপথে পাচারের অনিশ্চিত জীবনে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালানোর দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অপরাধীরা গহিন পাহাড়ে গা ঢাকা দিচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, গহিন পাহাড়ের প্রবেশপথগুলোতে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার মামলা করার কথা বলা হলেও, প্রাণের ভয়ে সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে সাহস পাচ্ছে না। এই আস্থার সংকট দূর করা প্রশাসনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যতক্ষণ স্থানীয় মানুষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনপ্রতিনিধিরা যৌথভাবে কাজ না করবেন, ততদিন এ অপরাধ রোধ করা সম্ভব হবে না।
টেকনাফের এ সংকটে সাধারণ মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চাষাবাদ ও মাছ ধরা বন্ধ হওয়ায় তৈরি হচ্ছে চরম খাদ্য সংকট। আমরা মনে করি, কেবল সাময়িক অভিযান দিয়ে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন পাহাড়ি অঞ্চলে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো এবং স্থানীয় দালালচক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর আইনের আওতায় আনা। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, নাগরিকরা তার নিজ ভূমিতে কাজ করতে গিয়ে আর কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হবে না। টেকনাফের মানুষকে এ মরণফাঁদ থেকে উদ্ধার করতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
কেকে/ এমএস