মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সরে আসার সিদ্ধান্ত অবশেষে কার্যকর হতে যাচ্ছে। এটি গত ৭ জানুয়ারির সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতা, যেখানে বলা হয়েছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ত্যাগ করবে যার মধ্যে ৩১টি জাতিসংঘের সংস্থা এবং ৩৫টি অ-জাতিসংঘ সংস্থা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে এই সংস্থাগুলো এখন ‘অগ্রহণযোগ্য’।
ইতিহাসে কোনো জাতীয় নেতা মাত্র এক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে এভাবে সর্বাত্মক সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। এমনকি কোনো নেতা এতটা নির্লজ্জভাবে ঘোষণাও করেননি যে, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই,’ যা ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কখন এই বিধিনিষেধগুলো প্রযোজ্য হবে তার একমাত্র বিচারক হবেন তিনি নিজেই এবং তার ক্ষমতা কেবল তার ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকবে।
গ্রিনল্যান্ড দখল করার মার্কিন হুমকি নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা যৌক্তিক। কিন্তু এটি এই বাস্তবতাকে আড়াল করে দিচ্ছে যে, আমেরিকার নিষ্ঠুরতার কারণে ইতোমধ্যে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্য কর্মসূচির তহবিল ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করেছে।
‘সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট’-এর মতে, এর ফলে প্রতিবছর বিশ্বে আনুমানিক অতিরিক্ত ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ এবং অন্যান্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সাহায্য কমানোর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২২.৬ মিলিয়ন (২ কোটি ২৬ লাখ) অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে যার মধ্যে ৫.৪ মিলিয়নই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এই সংখ্যাগুলো নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়বে।
অবশ্য আমরা আগেই জানতাম যে প্রশাসন ইউনেস্কো (টঘঊঝঈঙ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ), জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (টঘঐঈজ), ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা (টঘজডঅ) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (টঘঋচঅ)-এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। কিন্তু এখন আমরা জানি যে, আমেরিকা হবে প্রথম দেশ যারা জলবায়ু পরিবর্তনের চুক্তিতে পৌঁছানোর মূল কাঠামো ‘ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ ত্যাগ করবে।
একই সঙ্গে, ট্রাম্পের নতুন ‘বোর্ড অফ পিস’ (ইড়ধৎফ ড়ভ চবধপব)-এর প্রভাব নিয়ে কারও সন্দেহ থাকা উচিত নয়। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা প্রচেষ্টায় বিকল্প তৈরির এই চেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।
আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্থাগুলোর ওপর এই আক্রমণ যার মধ্যে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন এবং ভেনিস কমিশনও রয়েছে ভবিষ্যতে মার্কিন পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে খারাপ ইঙ্গিত দেয়। এটি সরকারি ব্যাখ্যার (যে অপচয় কমানো এবং ‘ওক’ (ড়িশব) এজেন্ডা মোকাবিলাই লক্ষ্য) ধারেকাছেও নেই। নারীর সমতা এবং অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোকে ‘সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি আদর্শিক কর্মসূচি’ আখ্যা দিয়ে ত্যাগ করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রশ্ন জাগে, ‘ইউএন উইমেন’ (টঘ ডড়সবহ)-এর মতো সংস্থাকে কীভাবে ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘অপচয়মূলক’ বলা যেতে পারে, যখন তারা ৮০টিরও বেশি দেশকে জেন্ডার-রেসপন্সিভ বাজেট তৈরিতে সাহায্য করেছে?
গৃহযুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য সংকটের শিকার নারী ও শিশুদের সহায়তাকারী জাতিসংঘের সংস্থাগুলো থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তটি এক ধরনের প্রতিহিংসার পর্যায়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে ‘এডুকেশন ক্যানট ওয়েট’ (যা আমি একসময় পরিচালনা করতাম), ওএসআরএসজি-এসভিসি (যৌন সহিংসতা বিষয়ক সংস্থা) এবং এসআরএসজি-ভ্যাক (শিশুদের সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক সংস্থা)। এই সংস্থাগুলো পর্যাপ্ত অর্থ না পেলে বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় নারী ও শিশুরা সহিংসতা ও মাতৃমৃত্যুর চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আমেরিকান জনগণের রক্ত, ঘাম এবং সম্পদ এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো আর গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এর বিনিময়ে প্রায় কিছুই পাওয়া যায় না।’ কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশগুলোর নারী ও শিশুদের কষ্ট লাঘবে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর কারণে আমেরিকান নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন দাবি করাটা সম্পূর্ণ কপটতা। এটি নির্দেশ করে যে, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত ‘জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ’ এর অধিকার যেন কেবল পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য।
ইউএন উইমেন এবং ওএসআরএসজি-এসভিসির মতো সংস্থাগুলো নারীদের আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করে, আইনি সহায়তা দেয় এবং মানসিক সমর্থন যোগায়। তারা বাল্যবিবাহ এবং জোরপূর্বক অঙ্গহানি বন্ধে কাজ করে। বিশ্বের অনেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত নারীরা এখন নিরাপদ আশ্রয় হারাবে, এমন এক সময়ে যখন সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতা ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ) অর্জনে শিশু সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসআরএসজি-ভ্যাক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একযোগে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করে। একইভাবে, ইউএনএফপিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এইচআইভি সংক্রমণ কমাতে উদ্যোগ নেয়, যা প্রজননক্ষম নারী ও শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
অধিকারের ওপর এই আঘাত কেবল নারী নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কন্যাশিশুদের শিক্ষা সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। বিশ্বজুড়ে স্কুলে না যাওয়া ১২২ মিলিয়ন মেয়ের সংখ্যা আরও বাড়বে, যা ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, ‘এডুকেশন ক্যানট ওয়েট’ ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করে ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে মেয়েদের স্কুল নিশ্চিত করার জন্য, যাতে তাদের বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করা যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন ভুলভাবে ধরে নিয়েছে যে আমেরিকানরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভেঙে ফেলা সমর্থন করে। কিন্তু বিশালসংখ্যক মানুষ চায় দেশগুলো একসঙ্গে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান করুক। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৯৪টি দেশের ৯০% উত্তরদাতা মনে করেন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। মাত্র ৫-৬% মানুষ মনে করেন এই সহযোগিতা ‘সময়ের অপচয়।’
তদুপরি, বহুপাক্ষিকতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহের খবরের বিপরীতে, উত্তরদাতারা প্রায়শই নিজ দেশের সরকারের চেয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর আস্থা বিশ্বে ৬০%, আর জাতিসংঘের ওপর ৫৮%।
নারী ও কন্যাশিশুদের সুযোগ তৈরির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও ফলাফল একই আসত। সংকটের সময় নারী ও শিশুদের পরিত্যাগ করা কোনো আর্থিক বিচক্ষণতা নয়; এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আগামী কয়েক দশক বা প্রজন্ম ধরে বইতে হবে। এটি একটি চাক্ষুষ নৈতিক ব্যর্থতা এবং এটি আমাদের সবার জন্য লজ্জাজনক।
লেখক পরিচিতি : গর্ডন ব্রাউন যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অর্থায়নবিষয়ক দূত। সূত্র : প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: ফরহাদ নাইয়া
কেকে/ এমএস