জাতীয় নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে। আর মাত্র ৬ দিন পরেই নির্ধারিত হবে আগামীর সংসদ। তবে উৎসবমুখর এই নির্বাচনি আবহের আড়ালে যে গভীর ষড়যন্ত্র ও অস্থিতিশীলতার ছক আঁকা হচ্ছে, তা সচেতন নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরে পুলিশি অভিযানে অবৈধ নির্বাচনি সিল জব্দ এবং এতে রাজনৈতিক দলের নেতার সংশ্লিষ্টতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি অশুভ সংকেত।
লক্ষ্মীপুরের ঘটনায় যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—ব্যালট জালিয়াতির এক সুগভীর নীলনকশা। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক নেতার ফরমাসে গোপনে ব্যালট পেপারে মারার জন্য সিল তৈরি করা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, এটি জনগণের ভোটাধিকার হরণের সুপরিকল্পিত মহড়া। পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে সিলগুলো ধরা পড়লেও মাঠ প্রশাসনে থাকা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনুসারীদের মাধ্যমে এ ধরনের জালিয়াতিকে বৈধতা দেওয়ার যে পরিকল্পনা বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তা নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে ধূলিসাৎ করতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোট জালিয়াতিতে নারী কর্মীদের ব্যবহার করতে পারে একটি বিশেষ দল। দলটির নারী কর্মীরা এরই মধ্যে নির্বাচনি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কিছু উপদেষ্টা ও প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তির আচরণে সন্দেহ দানা বাঁধছে। প্রশাসনের একটি অংশ একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক ও নির্বাচনের ভরসাস্থল সেনাবাহিনী নিয়ে অবমাননাকর আচরণ। ঢাকা-১৭ আসনের এক প্রার্থীর সেনানিবাস এলাকায় সশস্ত্র প্রহরীসহ প্রবেশের চেষ্টা এবং পেশাদার দায়িত্ব পালনরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলেই আঘাত করে না, বরং দেশের রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশকেও চ্যালেঞ্জ করে। এ বিষয়ে ‘এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’-এর আলটিমেটাম বিষয়টির গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের ভেতরে নির্দিষ্ট ঘরানার মতাদর্শীদের আধিপত্য এবং পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। দীর্ঘ বিরতির পর জনগণ যখন একটি ভয়হীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখন এই সুযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে কোনো চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
আমরা মনে করি, শুধু সিল জব্দ বা বহিষ্কারের মধ্যেই সমাধান সীমাবদ্ধ নয়। যারা এই জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি। নির্বাচন কমিশনকে শুধু মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে থাকা বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও সজাগ হতে হবে। সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন—রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থাকে বিতর্কিত করার অপকৌশল রুখে দেওয়া না গেলে একটি ‘পাতানো’ বা ‘জালিয়াতির’ নির্বাচন এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। ভোটের পবিত্রতা রক্ষা এবং জনগণের প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত করা এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় অগ্নিপরীক্ষা। আমরা আশা করি, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের আধিপত্যের কাছে নতিস্বীকার না করে কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশপ্রেমের পরিচয় দেবে। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই হতে পারে সব ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব।
কেকে/এজে