মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর       কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে দুর্ভোগে না পড়ে : সমাজকল্যাণমন্ত্রী      রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ      হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      
সাহিত্য
টেলিফোন কল
মূল : তালেব আল-রিফাই
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

১৯৫৮ সালে কুয়েতে জন্মগ্রহণকারী তালেব আল-রিফাই বর্তমান বিশ্বের একজন প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক। তার  সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘শেভালিয়ার দে আর্টস এত দ্য লেত্রেস’ (নাইট অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস) উপাধিতে ভূষিত করে।

অনুবাদ : ফরহাদ নাইয়া

আজ সমুদ্রটা বেশ উত্তাল। আমি নিজের সঙ্গেই কথা বলছি, যদিও কেউ শুনছে না। সামনের কফিটা অভ্যাসের চেয়েও বেশি তিতকুটে লাগছে; মনে হচ্ছে আমি বোধহয় স্বাদের অনুভূতিই হারিয়ে ফেলছি।

সবটাই ঘটেছিল হুট করে, আমার অফিস ছুটির ঠিক আগমুহূর্তে। আমি তখনো ডেস্কে বসে কাজ করছি, এমন সময় বোর্ড অফিসের ডিরেক্টর আমাকে ফোন করে বললেন: ‘প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।’
তিনি আমাকে সচরাচর ডাকেন না। তার অফিসের দিকে হাঁটার সময় আমি মনে করার চেষ্টা করছিলাম- আমি কি কোনো ভুল করেছি? কোনো কাজ কি বাকি ফেলে রেখেছি?
রুমে ঢুকে বললাম, ‘শুভ সন্ধ্যা।’

সবসময়ের মতো তাকে বেশ শান্ত, রাশভারী আর গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘বসুন।’ আমাদের মাঝে একটা নীরবতার দেওয়াল যেন ঝুলে রইল। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন : ‘ডক্টর আমের, আপনি অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন মানুষ। আমি এক্সিকিউটিভ বোর্ডের কাছে সিইও পদের জন্য আপনার নাম প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তার কথাগুলো আমাকে এতটাই চমকে দিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল, যদি আরেকবার শুনতে পেতাম! কিন্তু তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে পরখ করছিলেন, তাই আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উত্তর দিলাম : ‘আশা করি আমি আপনার আস্থার মর্যাদা রাখতে পারব।’

‘আমি চাই না এই খবরটা অন্য কেউ জানুক,’ তিনি আমাকে সতর্ক করে দিলেন। ‘আমি নিজে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। আজ এই পর্যন্তই।’

নিজের ডেস্কে ফেরার পর সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুত মনে হতে লাগল। একটা ঘোর আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। কীভাবে মাত্র একটা বাক্য একজন মানুষকে এভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে? এটা শুধু অফিসের পদমর্যাদা বদলানোর বিষয় ছিল না; ছিল না সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন, বেতন দ্বিগুণ হওয়া, বাৎসরিক বোনাস কিংবা বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের হাতছানি। আসল ব্যাপারটি ছিল এই যে, পদোন্নতির চিন্তাটা একটা আবেশের মতো আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। আমার পুরো জীবনটা বদলে যেতে চলেছে। আমি দেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একটি কোম্পানির সিইও হতে যাচ্ছি।

পদোন্নতির আগেই জীবন বদলে যাওয়ার এই যে নিশ্চয়তা, সেটিই আসলে এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল স্ত্রীকে ফোন করে জানাই, কিন্তু প্রেসিডেন্টের সতর্কবাণীর কথা মনে পড়ে গেল। তা ছাড়া আমি জানি, ও সারাক্ষণ আমাকে জেরা করবে- ‘কী হয়েছে? কী খবর?’ তাই রহস্যটা নিজের কাছে রাখাই শ্রেয় মনে হলো।

‘ডক্টর তালেব, আপনি লেখক, আপনিই তো এই গল্পের বিষয়বস্তু বেছে নিয়েছেন। আমাকে এভাবে ঝুলিয়ে রাখবেন না।’
‘মিস্টার আমের, আমি শুধু গল্পের যুক্তি মেনে দৃশ্যগুলো সাজিয়ে যাই।’
‘আর আমি যে এভাবে ক’ পাচ্ছি, সেটা কি যৌক্তিক? আপনি কি গল্পের শেষটা একটু ত্বরান্বিত করে আমাকে সাহায্য করতে পারেন না?’
‘আমাকে কাহিনির মূল সুরের প্রতি সৎ থাকতে হবে।’
‘আপনি কি জানেন একজন মানুষের অস্থিরতা কেন তৈরি হয়?’
‘হ্যাঁ, জানি।’
‘তাহলে আমাকে সাহায্য করুন।’
‘চেষ্টা করব।’
‘দেখা যাক আপনার সাহায্য আমাকে কোথায় নিয়ে যায়।’

মনে হচ্ছিল সমুদ্রটা যেন ধূসর হয়ে গেছে... কফিটা জুড়িয়ে জল। আমি ওটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।

সেদিন অফিসে পা রাখতেই বোর্ড অফিসের ডিরেক্টর ফোন করলেন। তার গলায় তাড়া : ‘আপনার আপডেটেড সিভিটা এখুনি পাঠান।’
মিনিট খানেকের মধ্যেই আমি পাঠিয়ে দিলাম। আমি বুঝতে পারলাম বোর্ডের মিটিং খুব কাছাকাছি এবং সবার মুখে এখন আমার পদোন্নতির কথা। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় মনে পড়ল, গিন্নি বাজার থেকে কিছু জিনিস আনতে বলেছিল।
লাঞ্চের সময় ও আমার অস্থিরতা টের পেল। ‘তুমি কি খুব ক্লান্ত? আমি যা আনতে বলেছিলাম সেগুলো আনোনি কেন?’
‘ভুলে গেছি,’ কপালে হাত দিয়ে বললাম, ‘মাথাটা ধরেছে খুব।’
আমি জানি না কীভাবে ওর সামনে বসে ছিলাম, কারণ আমার মন আর প্রাণ তখন পড়ে আছে অন্য কোথাও- অধীর আগ্রহে ফোনের রিং হওয়ার অপেক্ষায়।

‘ডক্টর তালেব, আমি দুই সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করছি।’
‘বোর্ড মিটিংয়ের তারিখ তো আর আমি ঠিক করি না।’
‘আপনি লেখক, গল্পের সব ঘটনা আপনার জানা। আপনি চাইলেই একটা বাক্য লিখে আমাকে খুশি করে দিতে পারেন।’
‘গল্পের নায়ককে খুশি করলেই যে গল্পটা ভালো হবে, এমন কোনো কথা নেই।’
‘কিন্তু বালিশের নিচে ফোন নিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে আমি ক্লান্ত। বাথরুমে যাওয়ার সময়ও ফোন সঙ্গে রাখি। মনে হয় যেন ফোন বাজছে, কিন্তু আসলে কিছুই না।’
‘আপনি কি আগের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন না?’
‘আর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার সেই মিটিংটার কী হবে?’
‘আপনি এই গল্পের মূল চরিত্র। আপনাকে তো ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতেই হবে।’
‘দয়া করে হয় শেষটা লিখুন, না হয় স্বীকার করুন যে আপনি লিখতে পারছেন না...’
ঠিক তখনই আমাদের মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।

ঢেউগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে আছড়ে পড়ছে, চারদিকে সাদা ফেনা ছিটিয়ে দিচ্ছে। আমি বরং এক কাপ গরম কফির অর্ডার দিই।

আমি আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা অসম্ভব। মাথার ভেতর সারাক্ষণ নানা ছবি ঘুরছে: পুরস্কার, নতুন বেতন, আমার জন্য সহজেই খুলে যাওয়া সব বন্ধ দরজা। কিন্তু প্রতিটি চিন্তাই আবার আমাকে ওই ফোনের কাছে টেনে নিয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে অপেক্ষায়। বারবার চেক করে দেখি প্রেসিডেন্টের নম্বরটা আমার কন্টাক্ট লিস্টে ঠিকঠাক সেভ করা আছে কি না।

গতকাল ধৈর্য হারিয়ে আমি ওপরের তলায় গেলাম, যদিও যাওয়ার কোনো বিশেষ দরকার ছিল না। ডিরেক্টর আমাকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘শুভ সকাল, মিস্টার আমের।’
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু তিনিই আগে বলে উঠলেন, ‘প্রেসিডেন্ট তো গতকালই চলে গেছেন।’
আমার বুকটা ধক করে উঠল। তিনি কবে ফিরবেন ডিরেক্টর তা বলেননি। আমি বিষণ্ন মনে নিজের রুমে ফিরে এলাম।

‘ডক্টর তালেব আল-রিফাই, আমি আর কোনো পদোন্নতি চাই না।’
‘হৃদয়ের গভীরের আকাক্সক্ষা থেকে তো আপনি পিছিয়ে আসতে পারেন না।’
‘কিন্তু আপনিই তো এটা তৈরি করে আমার মাথায় আর হৃদয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন!’
‘আর আপনিও তো সেই চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলেন।’
‘তাহলে এবার গল্পের শেষটা লিখে ফেলুন...’
‘আমি ভেবে দেখব।’
‘অসহ্য!’
একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে আমার সম্বিত ফিরে এলো। সঙ্গে সঙ্গে ফোনের দিকে তাকালাম। বুঝতে পারছিলাম না কলটা কি শেষ হয়ে গেল, নাকি আদৌ শুরুই হয়নি।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  টেলিফোন কল   তালেব আল-রিফাই   ফরহাদ নাইয়া  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

সাহিত্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close