ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক গণসংযোগে নেমেছেন একাধিক প্রার্থী। এ আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, মূল আলোচনায় রয়েছেন চারজন প্রার্থী। এছাড়া, এই আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা ২০২৬ সালের নির্বাচনে একক আসনে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থীর রেকর্ড।
এই আসনে লড়াই মূলত ‘তিন সাইফুল ও এক তাসলিমা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ আসনে নারী প্রার্থী রয়েছেন দুজন—গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সালমা আক্তার।
তবে বেশি আলোচনায় থাকা চার প্রার্থী হলেন—সাইফুল হক (কোদাল প্রতীক, বিএনপি সমর্থিত), সাইফুল আলম নীরব (স্বতন্ত্র প্রার্থী, ফুটবল প্রতীক), সাইফুল আলম খান মিলন (জামায়াতে ইসলামী, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক), তাসলিমা আখতার (গণসংহতি আন্দোলন, মাথাল প্রতীক)।
গত কয়েকদিন ধরে সরেজমিনে দেখা গেছে, যদিও ১৫ জন প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে সক্রিয়, বাস্তবে ভোটের হিসাব ঘুরছে এই চারজনকে কেন্দ্র করেই। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হকের প্রতিশ্রুতি—একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি সমর্থিত কোদাল প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস করছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, আমি নির্বাচিত হব। নির্বাচিত হলে এই আসন থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মাদক নির্মূলে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, এই আসনে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয়ে থাকে। নির্বাচিত হলে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করবেন বলে জানান। দলমত নির্বিশেষে এলাকার সাধারণ মানুষ তাকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী নীরবের ‘মডেল আসন’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সাইফুল আলম নীরব খোলা কাগজকে বলেন, “নির্বাচিত হলে ঢাকা-১২ আসনকে একটি মডেল আসনে রূপান্তর করব। প্রথম তিনটি কাজ হবে—সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা।”
তিনি বলেন, “আমি এই এলাকার সন্তান। ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের দায়িত্বও পালন করি। সারা দেশে যুবদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে এলাকার মানুষ আমাকে ভালোভাবে চেনেন।” সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শতভাগ ভোটে বিজয়ী হবেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নারী ও শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার। খোলা কাগজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “নির্বাচিত হলে সংসদে গিয়ে নারীর অধিকার ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করব।”
দীর্ঘদিন মানবসেবায় যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তার পোস্টারে লেখা রয়েছে—বৈষম্য রাষ্ট্র চাই না, নারীর অধিকার ফেরত চাই—কথা কম, কাজ বেশি।”
তিনি জানান, ভোটের দিন সবার আগে ভোট দেন শ্রমজীবী মানুষরা এবং তার পক্ষে তারাই রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে শ্রমজীবী মানুষের ভোটেই বিজয়ী হবেন বলে দাবি করেন।
এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, তার নির্বাচনি এলাকায় ব্যানার ও বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তার ভাষায়, “তারা ভয় পাচ্ছে, কারণ শ্রমজীবী মানুষের ভোট আমি পাব।”
জামায়াত প্রার্থীর চাঁদাবাজি বিরুদ্ধে অবস্থান
জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, “ঢাকা-১২ আসনে রয়েছে বহু বাণিজ্যিক এলাকা ও অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এখানে দেশের অন্যতম বড় বাজার কারওয়ান বাজার, ইলেকট্রনিক ও গ্রোসারি মার্কেটসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে—যেখানে ব্যাপক চাঁদাবাজি হয়। নির্বাচিত হলে প্রথমেই চাঁদাবাজি বন্ধ করব এবং বাজারগুলোকে আধুনিক বাজারে রূপান্তরিত করা হবে।” পাশাপাশি এই আসনের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড আধুনিকীকরণ ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার কথাও জানান তিনি।
প্রার্থী ও ভোটার পরিসংখ্যান
ঢাকা-১২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৩৩,৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৭৪,৩৪৯ জন; নারী ভোটার ১,৫৮,৯৬৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩ জন।
এই আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা ২০২৬ সালের নির্বাচনে একক আসনে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থীর রেকর্ড।
প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—সাইফুল হক (বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি–বিএনপি সমর্থিত), মো. সাইফুল আলম (জামায়াতে ইসলামী), সাইফুল আলম নীরব (স্বতন্ত্র), সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (জাতীয় পার্টি), মাহমুদুল হাসান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মো. তারেক রহমান (আমজনতার দল), কল্লোল বনিক (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি), মোমিনুল আমিন (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন এনডিএম), ফরিদ আহমেদ (জনতার দল), সালমা আক্তার (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ), মোহাম্মদ শাহজালাল (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট), মুনতাসির মাহমুদ (বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট), আবুল বাশার চৌধুরী (গণঅধিকার পরিষদ), তাসলিমা আখতার (গণসংহতি আন্দোলন) ও মোহাম্মদ নাঈম হাসান (বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি)।
ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬টি ওয়ার্ড—২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এ আসনের অন্তর্ভুক্ত থানাগুলো হলো—তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর (আংশিক) ও রমনা (আংশিক)।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঢাকা-১২ আসনে চার প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
কেকে/এলএ