এক পীরের ফতোয়ায় শঙ্কা আর ভয়ে ভোট দেন না। ভোট দিতে গেলে পর্দার খেলাপ হবে এমন কথারও প্রচলন রয়েছে। যদিও মহামারি এবং বিপদ-আপদের ভয়ে অন্য ধর্মের নারীরাও ভোট দেন না। এমন ঘটনা ঘটে চলেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে।
এখানে নারীরা অন্তত ৫ দশক ধরে ভোট প্রদান থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। অথচ স্থানীয় ও জাতীয় যে কোনো ভোটেই নির্বাচন কমিশন প্রতিটি কেন্দ্র ভোট প্রদানের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখেন। রাখতে হয় কারণ নারীরা ভোট না দিলেও পুরুষরা তো ভোট দেন। মজার বিষয় হলো, এ ইউনিয়নের নারী প্রার্থীরাও নির্বাচিত হন পুরুষের ভোটে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, উনিশশতকের মাঝামাঝি সময়ে জনৈক পীর মওদুদ হাসান জৈনপুরী (র.) এক মাহফিলে ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া পর্দার খেলাপ হয়। সেই থেকে স্থানীয় ৯টি গ্রামের নারীরা নিজেদের ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকেন। শুরুর দিকে সংখ্যাটি কত এমন তথ্য নিশ্চিত হতে না পারলেও ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ডাকাতিয়া নদীর তীরে এই ইউনিয়নের ৯ গ্রামের জনসংখ্যা ২৩,৮৫৪। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৩,২৯৫ জন। পুরুষের চেয়ে যা প্রায় ৩ হাজার বেশি।
স্থানীয় মো. সবেদ আলী (৭২) ও রইসুল ইসলাম সহ কয়েকজন বলেন, “কলেরা মহামারির কারণে জৈনপুরের পীর সাহেব বলেছিলেন নারীরা ভোট কেন্দ্র না যেতে। আবার ভোট দিতে গেলে ভোট কেন্দ্রে গন্ডগোল হয় এজন্যও নিষেধ করেছেন তিনি। আবার পর্দার কথাও শোনা যায়। সবশেষ ভালই করেছেন। কারণ ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কী?”
১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বলেন, ‘গত এক দশকে ১০-১২ জন নারী ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এ সংখ্যা কোনোভাবেই বাড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিবছর দুই-তিনজন উদ্বুদ্ধ হলেও অদৃশ্য কারণে আবার নিরুৎসাহিত হয়ে যান তারা। অথচ ভোট না দিলেও সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ঠিকই নিচ্ছে নারীরা। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।’
চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে যেন সবাই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যার-যার ভোট প্রদান করেন, সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ সহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসন বারবার সচেতনতামূলক সভা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের ভোটকেন্দ্রে আনার চেষ্টা করছে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও এ ইউনিয়নের নারীদের নিয়ে দুইবার উদ্বুদ্ধ সভা সম্পন্ন হয়েছে।’
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও রির্টানিং অফিসার মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এতোদিন শিক্ষা ও সচেতনতার যে অভাব ছিল তা এখন আর নেই। এ নির্বাচনে অনেক নারীই ভোট কেন্দ্রে এসে তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করবে।’
কেকে/এলএ