মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নির্বাচনি হারজিত ও গণতন্ত্রের দায়
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:৩৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট গতকাল শেষ হলো। ব্যালট বাক্স সিলগালা, ফলাফল ঘোষিত বা ঘোষণার প্রক্রিয়ায়। বিজয় মিছিল কোথাও শুরু হয়েছে, কোথাও হতাশা নীরব ক্ষোভে জমাট বাঁধছে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় ঠিক এই মুহূর্তে, ভোটের পরদিন। কারণ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নাগরিক আস্থার পরিমাপক।

এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল জটিল। ভোটের আগের রাত থেকেই বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, এজেন্ট বের করে দেওয়া, জাল ভোট বা ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন- এসব অভিযোগ ঘুরপাক খেয়েছে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে। কোথাও ফাঁকা ফলাফল শিট উদ্ধারের খবর, কোথাও বিপুল পরিমাণ টাকাসহ দলের নেতা আটক, কোথাও আইন অমান্য করে প্রচারণা চালাতে গিয়ে প্রার্থী আটক, কোথাও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। আবার একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি, এসবও ছিল বাস্তবতার অংশ। অর্থাৎ চিত্রটি একরৈখিক নয়; বরং আস্থা ও সংশয়ের মিশ্র বাস্তবতা।

নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, মেয়াদসীমা, সংসদীয় বিন্যাস, বিচার বিভাগের প্রশ্ন, এ ধরনের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব একযোগে জনমতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি রাজনৈতিকভাবে চাতূর্যময় উদ্যোগ, এমন মত আছে। সমালোচকরা বলছেন, জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নে পর্যাপ্ত জনআলোচনা হয়নি। ফল যা-ই হোক, পরিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ছাড়া এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এ নির্বাচন নিবিড় নজরদারিতে ছিল। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ব্রিফিং, বিভিন্ন কূটনৈতিক বিবৃতি, ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচনের আহ্বান-সব মিলিয়ে বোঝা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ এখন বৈশ্বিক আলোচনার অংশ। ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকের উপস্থিতি নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়নের পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষণ কেবল প্রক্রিয়া দেখে। গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনবিশ্বাস।
এখন প্রশ্ন, এরপর কী?

প্রথমত, বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। নির্বাচনে জয় সাংবিধানিক বৈধতা দেয়, কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা আসে আচরণ থেকে। বিজয়ী পক্ষের উচিত উদারতার ভাষা বেছে নেওয়া। প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা আর প্রতিপক্ষকে অবমাননা করা এক জিনিস নয়। গণতন্ত্রে স্থিতিশীলতা আসে অন্তর্ভুক্তি থেকে, একচেটিয়াকরণ থেকে নয়। যারা ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তারাও রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। তাই বিজয়ী শক্তি সরকার গঠনের পর তাদের পক্ষ থেকে প্রথম বার্তাই হওয়া উচিত ‘এই রাষ্ট্র সবার’।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া জরুরি। বিজয় মিছিল যেন ভীতি প্রদর্শনে পরিণত না হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা দুর্বল রাজনৈতিক সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আইন প্রয়োগে দলীয় পরিচয় নয়, নাগরিক অধিকার বিবেচ্য হতে হবে। যদি  কোথাও অনিয়ম বা কারচুপির অভিযোগ ওঠে, তা অবজ্ঞা না করে স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়াই আস্থার পথ।

গণভোটের মূল প্রক্রিয়াটি যেহেতু প্রশ্নবিদ্ধ, তাই অধিকাংশ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতাহীন এ ফলাফল নিয়ে এখন আর সাংবিধানিক সংস্কারের পথে হাঁটা কতটুকু যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত হবে তা নিয়ে গভীর ভাবনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো নয়, নির্বাচিত সরকার ও নতুন সংসদের ওপর গণভোটের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংস্কার কার্যক্রম ন্যস্ত করাই বাস্তবসম্মত হবে। সংবিধান কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার দলিল নয়; এটি সামাজিক চুক্তি। সেই চুক্তি পরিবর্তনে যত বেশি ঐকমত্য, তত বেশি স্থায়িত্ব। জাতীয় সংলাপ, বিশেষজ্ঞ মতামত, সংসদীয় বিতর্ক, এসব প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে এগোতে হবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষণীয় নয়। প্রায় তিন হাজার কোটির বেশি ব্যয়ে এই নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে জনগণ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগীরা প্রথমেই দেখতে চান, দেশে পূর্বানুমেয় নীতি ও শান্ত পরিবেশ আছে কি না। সুতরাং রাজনৈতিক উদারতা এখানে অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

দ্বিতীয়ত, পরাজিত দলগুলোর ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণরায় মেনে নেওয়া বা যুক্তিসংগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা-দুই পথই গণতান্ত্রিক। কিন্তু চ্যালেঞ্জ হতে হবে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে। আদালত, নির্বাচন কমিশন, সংসদ- এ প্রতিষ্ঠানগুলোই বিরোধিতার ক্ষেত্র। সহিংসতা বা অরাজকতার পথ বেছে নিলে জনসমর্থন ক্ষয়ে যায় এবং রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়।

সংসদে উপস্থিত থেকে শক্তিশালী বিরোধিতা গণতন্ত্রকে কার্যকর করে। সংসদ বর্জন প্রতীকী প্রতিবাদ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব কমিয়ে দেয়। জনগণবিরোধী দলকে শুধু প্রতিবাদের জন্য নয়, বিকল্প নীতি উপস্থাপনের জন্যও ভোট দেয়। সেই দায়িত্ব পালন করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।

দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণও বড় দায়িত্ব। নির্বাচনের উত্তেজনা সহজেই সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। নেতৃত্বের সংযত বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বার্তা দেয়, গণতন্ত্রে লড়াই আছে, কিন্তু শত্রুতা নেই।

তৃতীয়ত, উভয় পক্ষের একটি যৌথ দায়িত্ব রয়েছে, গণতান্ত্রিক ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা। রাজনৈতিক বক্তব্যে অবমাননা, হুমকি বা বিদ্বেষের সুর দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মতভেদ থাকবেই। কিন্তু মতভেদের ভাষা হতে হবে শালীন ও যুক্তিনির্ভর। নির্বাচন কমিশন, আদালত, প্রশাসন, এসব প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া এটিও যৌথ কর্তব্য।

এই নির্বাচন আমাদের আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে- আস্থার ঘাটতি। জরিপ বলছে, উল্লেখযোগ্য অংশের নাগরিক মনে করেন তাদের মতামত সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয় না। সব সমস্যার সমাধান কেবল নির্বাচন দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক অর্থায়ন স্বচ্ছ করা, নারীর ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, এসব দীর্ঘমেয়াদি করণীয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও নজরে রাখতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে মূল্যায়ন করবে অংশগ্রহণ, সহিংসতার মাত্রা ও পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। প্রতিবেশী দেশগুলো স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অর্থনৈতিক সংস্কারের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। তাই অভ্যন্তরীণ দায়িত্বশীলতা আন্তর্জাতিক আস্থারও ভিত্তি।

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ব্যালটের সংখ্যায় নয়, বিশ্বাসের গভীরতায়। যদি নাগরিক বিশ্বাস করেন তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হয়েছে এবং তাদের কণ্ঠ শোনা হয়েছে, তবে নির্বাচন সফল। আর যদি সন্দেহ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অস্বস্তিকর হয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটের পর দিন তাই উদ্যাপন বা হতাশার চেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে ভিন্নমতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়? আমরা কি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার মানদণ্ড শক্তিশালী করতে পেরেছি? আমরা কি সংবিধানের ঘোষিত সমতা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছি?

ত্রয়োদশ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকবে। এটি হয়তো স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় খুলবে, হয়তো দীর্ঘ বিতর্কের সূচনা করবে, অথবা হয়তো কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে। ফলাফল যাই হোক, এখন দায়িত্বশীল আচরণই নির্ধারণ করবে এর ঐতিহাসিক মূল্য।

ক্ষমতা সাময়িক; আস্থা স্থায়ী। বিজয়ীদের দায়িত্ব উদারতা, পরাজিতদের দায়িত্ব দায়িত্বশীল বিরোধিতা, আর উভয়ের দায়িত্ব গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা। নির্বাচন শেষ হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের অনুশীলন এখনই শুরু। যদি আমরা এই অনুশীলনকে সততা ও সংযমের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারি, তবে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কেবল একটি তারিখ নয়, গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার স্মারক হয়ে থাকবে।

কেকে/এমএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  নির্বাচনি হারজিত   গণতন্ত্রের দায়   রাসেল আহমদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close