ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর সরকার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। তবে দলটির সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা হয়েছে।
এদিকে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। অর্থনীতিও আলোর মুখ দেখেনি, কমেছে বিনিয়োগ। মব সন্ত্রাসের কারণে সৃষ্টি হয় নিরাপত্তাহীনতার।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। স্থবির অর্থনীতিকে সচল করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, আইনশৃঙ্খলা-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতি সচল করাই আগামী সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। গতকাল শুক্রবার বিকালে নিজের নির্বাচনি এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরেছেন মির্জা ফখরুল। এসময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতিকে সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এ ফলাফল এক হচ্ছে আনন্দময়, আরেকটা হচ্ছে বিষাদময়। আমাদের দলের প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এই অভূতপূর্ব বিজয় দেখে যেতে পারলেন না এটা বিষাদময়।
তিনি বলেন, অনেক রক্তের বিনিময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে একটা চমৎকার উৎসবমুখর এবং স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ডেফিনেটলি অভিভূত, মুগ্ধ। এ ধারাবাহিকতা যদি আমরা রাখতে পারি তাহলে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারব।
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবিরপ্রায় অর্থনীতির প্রপেলারে গতি সঞ্চার করা। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রলেপ দেওয়ার আওয়াজ তুললেও সেখানে সফলতার পাল্লা ভারী হওয়ার বদলে ব্যর্থতাই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সব খাতে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ‘দুঃশাসনের’ পাতা উলটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর তাগিদ যেমন নতুন সরকারের ওপর থাকবে, তেমনি দুর্নীতি আর ভুল নীতির নির্মম শিকার অর্থনীতিকে সুস্থ করে তুলতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে চড়ে থাকা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের ক্ষত নিরাময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার বহুমুখী চাপ মিলিয়ে কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে হবে আগামী প্রশাসনকে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরসূরিদের জন্য যে অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, সেখানে যোগ হয়েছে বিনিয়োগের আস্থাহীনতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়া প্রশাসনকে এসেই চাঁদাবাজির লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে নজর দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে বাণিজ্য নীতি তৈরির সঙ্গে সঙ্গে রুগ্ন রাজস্ব কাঠামো ঢেলে সাজাতে হবে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কীভাবে সমঝোতা করে ব্যবসা বাড়ানো যায়, সেই উপায় খুঁজতে হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রভাব এখন স্পষ্ট; আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তার বড় অংশ বিদেশে পাচারের ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এখনো প্রকট। সে সময় অর্থনীতির ক্ষতগুলো নানাভাবে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে রাখায় প্রকৃত চিত্র অজানাই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তার কিছুটা তথ্য বাজারে ছাড়লেও তাদের রেখে যাওয়া ব্যর্থতার চিত্র উঠে আসতে ঢের সময় লাগবে।
দেড় বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে যে দশায় পেয়েছে, বিদায় বেলায় রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতের আপাত স্থিতিশীলতা ছাড়া সংখ্যার বিচারে আর কোথাও ইতিবাচক পদাঙ্ক রেখে যেতে পারছেন না।
এদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। উচ্চ সুদের হার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আস্থা রাখতে পারছেন না। তাতে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কেমন চলছে- তা দেখার সূচক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারেও আশা জাগানোর মতো কিছু নেই।
স্বস্তি নেই বিদেশি ঋণের অর্থ ছাড়েও। বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিদেশি ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানে উল্লম্ফন দেখাবে- এমন প্রচারণা থাকলেও ঘটেছে উলটোটা। ডিসেম্বর শেষে দেখা যাচ্ছে, আগের ছয় মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানে যে পরিমাণ অর্থ ছাড় হয়েছে, তা গত বছরের ছয় মাসের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। ফলে এই বাহিনীকে পনুর্গঠন করে জনমুখী একটি বাহিনীতে রূপান্তর করতে হবে। না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে নতুন সরকারকে। মবের তাণ্ডবে গত দেড় বছরে যে ভয়ের রাজত্ব তৈরি হয়েছে, তার থেকে পরিত্রাণ চান নাগরিকরা।
এদিকে চাঁদাবাজি, দখলবাজির লাগাম টেনে ধরতে হবে নতুন সরকারকে। বিশেষ করে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরানো হবে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কেকে/এমএ