মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধন কমিটি, বিরোধীদের ওয়াকআউট      তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা      ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বাঙালি ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:৩৬ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সমাপ্ত হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশের ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি দলের মধ্যে লড়াই ছিল মূলত বহুমাত্রিক। তবে নির্বাচনি ময়দানের সমীকরণ এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি ধ্রুব সত্য বারবার সামনে আসে- বাঙালি জাতি ধর্মপ্রাণ, কিন্তু তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেয় না।

এবারের নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২৯১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২১২টি আসনে জয়লাভের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোট নির্বাচনি মাঠে ধর্মকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই জোটটি ভোটারদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে প্রচার চালিয়েছিল যে, তাদের ভোট দেওয়া মানে পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত করা। এমনকি নিজেদের ইসলামের ‘সোল এজেন্ট’ হিসেবে দাবি করার মতো ঘটনাও বিভিন্ন জনসভায় দেখা গেছে। কিন্তু ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। জান্নাতের টিকেট বিক্রি করেও মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়নি তবে কিছুটাচ সফল তারা হয়েছে। এর আগে এতো বেশি আসন তারা লাভ করেনি। ১১ দলীয় জোট মাত্র ৭৬টি আসনে জয়ী হতে পেরেছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল এ দেশের সাধারণ মানুষ সাদরে গ্রহণ করেনি।

বিভিন্ন সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা এই নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিল। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নগদ ৭৪ লাখ টাকাসহ আটক করার খবরটি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পুলিশের বিশেষ অভিযানে ধরা পড়া এই বিপুল অর্থ উত্তরাঞ্চলের ভোট কেনার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শীর্ষ পদে জামায়াত ঘরানার ব্যক্তিদের আধিপত্য লক্ষ্য করা গেলেও ভোটারদের ওপর এর প্রভাব ছিল নগণ্য। বিগত স্বৈরাচারী সরকারও একসময় কওমি ধারার আলেমদের তোষণ করে এবং ‘কওমি জননী’ উপাধি নিয়ে ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধকে সমান্তরালে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই তাসের ঘরও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি।

বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোনো কট্টর ধর্মীয় রাজনৈতিক দল এককভাবে ১০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন বা ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি মুসলিমরা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের চেয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল। এটিই প্রমাণ করে যে, বাঙালি ভোটাররা ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক হলেও ভোট দেওয়ার সময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাঙালির ইসলামচর্চা অনেকটা সুফিবাদ ও পীর-মাশায়েখের ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে, যা উদার ও সহনশীল। বিভিন্ন সময়ে তালেবানি বা ওহাবি মতাদর্শের অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা করা হলেও বাংলার লোকজ সংস্কৃতি (যেমন: পহেলা বৈশাখ, নবান্ন) এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির কারণে সেই চরমপন্থা শিকড় গাড়তে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের বড় পরাজয় মূলত এই ‘সাংস্কৃতিক বাফার’-এরই ফলাফল। 

বিগত কয়েক দশকের নির্বাচনে দেখা গেছে, যেসব দল ধর্মকে ‘সোল এজেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে জান্নাতের টিকিট বা ধর্মের অবমাননার ধোঁয়া তুলে ভোট চেয়েছে, সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি সন্দিহান থেকেছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করে, কট্টরপন্থি দল ক্ষমতায় এলে তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অধিকার সংকুচিত হবে। এবারও ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার এই চরমপন্থা প্রত্যাখ্যানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন। 

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জামায়াত ও তাদের সহযোগীদের মালিকানাধীন ব্যাংক, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশাল নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও তারা সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেনি। টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার প্রচেষ্টা বা প্রশাসনিক পদে নিজেদের লোক বসানো সত্ত্বেও জনবিস্ফোরণ বা জনরায় কখনোই তাদের পক্ষে যায়নি। কারণ, বাঙালিরা সাহায্য গ্রহণ করলেও রাজনৈতিক আনুগত্যের ক্ষেত্রে নিজেদের ‘লিবারেল’ পরিচয় বিসর্জন দেয় না।আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি বিরল উদাহরণ যেখানে বিপুল মুসলিম জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও মানুষ বারবার গণতান্ত্রিক ও তুলনামূলক উদারপন্থী দলগুলোকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্ববাসীকে এই বার্তাই দিয়েছে যে, বাংলাদেশ কোনোভাবেই ‘দ্বিতীয় আফগানিস্তান’ হওয়ার পথে পা বাড়াবে না। 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ তার ‘বাঙালি পরিচয়’ এবং ‘মুসলিম পরিচয়’-এর মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখে। ১৯৭১ সালে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা (পাকিস্তান) ভেঙে বেরিয়ে আসার যে চেতনা, তা এখনো বাঙালির রক্তে বহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল মূলত সেই ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’কে দ্বিতীয়বার কবর দেওয়ার নামান্তর।

বাঙালি জনপদের মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধর্মভীরু। তারা মসজিদে যায়, মন্দিরে যায়, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে। কিন্তু যখনই শাসনব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন আসে, তখন তারা আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো উগ্রবাদী বা মৌলবাদী মডেলকে প্রত্যাখ্যান করে। বিএনপি এই নির্বাচনে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি এবং গণতান্ত্রিক ধারার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে বলেই সাধারণ ভোটাররা তাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, এ দেশের মাটিতে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির চাষাবাদ করা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ চায় একটি উদার, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে ধর্ম থাকবে মানুষের বিশ্বাসের জায়গায়, কিন্তু তা ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রায় মূলত ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বাঙালির চিরন্তন উদার নৈতিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাঙালি ধর্মভীরু   ধর্মান্ধ নয়   শাহ মো. জিয়াউদ্দিন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close