ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অধ্যায়ে নতুন একটি পর্ব শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশের ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২৯১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২১২টি আসনে জয়লাভের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলই শেষ কথা নয়। এখন মূল প্রশ্ন- নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত এবং কতটা আন্তরিকভাবে বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনি ইশতেহারে যে অঙ্গীকারগুলো ছিল, সেগুলোর বাস্তব রূপই নির্ধারণ করবে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতি।
প্রথম এবং সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, বিনিয়োগের স্থবিরতা সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ স্পষ্ট। ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত নীতি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কর ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শিল্প-উদ্যোগে আস্থা তৈরি ছাড়া এই প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সহাবস্থান। নির্বাচনের পর প্রতিশোধের রাজনীতি বন্ধ রাখা, প্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা-এগুলো শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক শর্ত। সরকার যদি শুরুতেই এই জায়গায় দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত তৈরি হবে। অন্যথায় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হবে।
তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা। সংসদকে কার্যকর করা, নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা- এসবই ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই প্রমাণ হবে যে ক্ষমতা পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেরও সূচনা করেছে।
চতুর্থত, তরুণদের প্রত্যাশা। কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ছিল জোরালো। বাস্তবে শিল্পে বিনিয়োগ, স্টার্টআপ সহায়তা, কারিগরি শিক্ষা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়া এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তরুণদের আস্থা ধরে রাখতে হলে দৃশ্যমান উদ্যোগ জরুরি।
পঞ্চমত, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার। দুর্নীতি দমন কেবল স্লোগান নয়; এটি কার্যকর না হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতেই অচলাবস্থা তৈরি হয়। সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা, সেবা খাতে ডিজিটালাইজেশন এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা- এই জায়গায় বাস্তব পরিবর্তন দেখাতে না পারলে অন্য সব উন্নয়ন প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সবশেষে, পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন ধারাবাহিকতা। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির আকস্মিক পরিবর্তন না এনে ধাপে ধাপে সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা থাকলে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক আস্থাও বাড়ে।
নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি আসলে জনগণের সঙ্গে সরকারের নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তি রক্ষা করতে হলে দ্রুত ফল দেখানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথও খুলতে হবে। অর্থনীতি, সুশাসন, কর্মসংস্থান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সচলায়তন -এই চারটি ক্ষেত্রেই যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি আসে, তবে নতুন সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে পারবে। দেশের মানুষ একটি কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের দেখা পাবে।
কেকে/এমএ