ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ২১৯টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফল কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, এটি জনগণের স্পষ্ট বার্তা।
মানুষ স্থিতিশীলতা, কার্যকর নেতৃত্ব এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে। সেই প্রত্যাশার জায়গায় বিএনপি নিজেদের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এই জয়ের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গঠন, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় ইস্যুতে সরাসরি কাজ।
বিএনপি শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নয়—ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়েও কর্মসূচি সক্রিয় রেখেছে। প্রার্থী বাছাইয়ে ত্যাগী, সিনিয়র এবং হেভিওয়েট প্রার্থীর পাশাপাশি অনেক জায়গায় নতুন মুখ আনা হয়েছে, যারা এলাকার মানুষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ভোটাররা শুধু দলীয় প্রতীক নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করেছেন। তরুণ ভোটারদের একটা বড় অংশ যদিও সোস্যাল মিডিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে বলে লেখালেখি করেছিল কিন্তু বাস্তবতায় বিএনপির কর্মসূচিতেও লাখ লাখ তরুন সরাসরি অংশ নিয়েছে। মাঠের প্রতিযোগিতা, সভা সমাবেশ, দরজায় দরজায় যোগাযোগ এবং বাস্তব সমস্যা নিয়ে অবস্থান নেওয়া এই সাফল্যের মূল শক্তি।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলে তার সামনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লিডার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার একটা বড় সুযোগ থাকবে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দল হিসেবে এই মুহূর্তে বিএনপিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার। দক্ষ, সৎ ও পেশাদার রাজনৈতিক নেতাদের এবং তুলনামূলক অধিক ব্যক্তিত্ববান বিজয়ী প্রার্থীদের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সরকার আরও শক্ত ভিত্তি পাবে। সিনিয়র ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয় নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
বিএনপি যদি শুরু থেকেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে তাহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে জনগণ দ্রুত ফল চায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বিএনপি ইতিমধ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয়ের সুরক্ষায় পরিকল্পনার কথা বলেছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তরুণদের আশার জায়গা তৈরি করবে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবমুখী হলে বেকারত্ব কমাতে তা কার্যকর হবে।
শিক্ষা ও সুশাসনের ক্ষেত্রেও বিএনপির সামনে স্পষ্ট পথ রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং স্কুল পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবায় ডিজিটাল প্রক্রিয়া বাড়ালে দুর্নীতি কমবে। আইন প্রয়োগে সমতা ও কঠোরতা থাকলে রাজনৈতিক সহিংসতাও কমবে। জনগণ এখন ফল দেখতে চায়, প্রতিশ্রুতি নয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনিসিপি জোট তাদের আলোচনা অনুযায়ী প্রত্যাশিত ফল পায়নি। তাদের বড় দুর্বলতা ছিল মাঠের রাজনীতির চেয়ে অনলাইন প্রচারের উপর এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বিজয়ের পর অতিরিক্ত আত্বনির্ভরতা। ফেইসবুক বা বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলের মত অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন থাকলেই বাস্তব ভোটে তা রূপ নেয় না। অনেক নেতাকর্মী মনে করেছিলেন ইউটিউব ও ফেসবুকের আলোচনাই বাংলাদেশের ভোটারদের জনমতের প্রতিফলন। বিশেষ করে পিনাকি ভট্টাচার্য, ইলিয়াস হোসেন ও কনক সারোয়ারের ইউটিউব বিশ্লেষণ ও বক্তব্যকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনলাইন ভিউ আর লাইক কমেন্ট এবং বাস্তব ব্যালটের ভোট এক বিষয় নয়।
বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠপর্যায়ে শক্ত অবস্থান, দল ও সংগঠন হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান, ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ছাড়া কেবল ডিজিটাল সোস্যাল মিডিয়ার প্রচার সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে স্থায়ী কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফলে দেখা গেছে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে যেখানে বিএনপি নিরংকুশ বিজয়মালা তাদের ঘরে পৌঁছাইতে পেরেছে, সেখানে জামায়াত তাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক গুণ পিছিয়ে পড়েছে।
জামায়াতের সাপোর্টারদের এবং কয়েকজন ইউটিবারদের অনলাইনে বিজয় পাওয়ার ভুল অবজারবেশন ও অতি উৎসাহি উচ্ছ্বাস বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। ভোটাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের চেয়ে প্রার্থীর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবস্থান, মাঠের উপস্থিতি, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক পরিচিতি ও এলাকায় প্রার্থীদের কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণেই বিএনপির সাথে লড়াইয়ে জামায়াত তাদের প্রত্যাশিত শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন দেখিয়েছে, বাংলাদেশের আপামর সাধারণ জনগণ এমন দলকে সমর্থন করে যারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে, রাজনৈতিক সহাবস্থান চায়, মাঠে কাজ করে, স্পষ্ট পরিকল্পনা দেয় এবং বাস্তব পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রাখে। বিএনপি সেই জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করতে পেরেছে। এখন তাদের দায়িত্ব আস্থা ধরে রাখা।
যদি বিএনপি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, শক্ত অর্থনীতি, সুশাসন নিশ্চিত, শিক্ষায় অগ্রাধিকার এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে—তবে বিএনপির এই নিরংকুশ বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয় বরং নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ ডীন, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/ এমএস