বছর ঘুরে আবার এলো রমজান। একটি আত্মসংযম ও সহমর্মিতার মাস। উপবাস কিংবা ক্ষুধার অনুভূতির মধ্য দিয়ে অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার সময়। তবে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে এই মাসে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নীরব আর্থিক চাপে পড়তেও হয়। বাজারে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি, সীমিত আয়, সামাজিক মর্যাদা রক্ষার বাধ্যবাধকতা মিলিয়ে রমজানে মধ্যবিত্তের সংকট ক্রমশ গভীর হয়, অথচ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এই শ্রেণী প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
উল্লেখ্য, আমাদের আয় বেড়েছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল কোন শ্রেণীর মানুষের হাতে পৌঁছেছে? সমাজের সব স্তরে যে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি, সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সাধারণত সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট আয় ও সীমিত বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। মাসিক আয়ের বড় অংশই বাসাভাড়া, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সঞ্চয়ের সুযোগ কম, আর অতিরিক্ত ব্যয়ের সামর্থ্য প্রায় নেই বললেই চলে।
রমজান এলে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, খেজুর, মুরগি ও গরুর মাংসের মতো পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়; এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দামও। ফলে তাদের বাজেটেও চাপ বাড়ে। সাম্প্রতিক বাজার তথ্যে দেখা গেছে, রমজানের প্রাক্কালেই ধরনভেদে খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে (বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা যেসব মানের খেজুর বেশি কিনেন, সে সবের), লেবু, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল, রসুন ও ছোলা প্রভৃতি নিত্য পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধি যে কেবলই সরবরাহ-চাহিদার স্বাভাবিক নিয়মের ফল, তা বললে বাস্তবতা পুরোটা ধরা পড়ে না।
যদিও দেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ) কিন্তু এবার বাজার স্থিতিশীল রাখতে নির্বাচনের আগেই গত বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছে সরকার। তবে সরেজমিন দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি ব্যস্ততার কারণে বাজার মনিটরিং শিথিল হয়ে পড়েছিল। এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রমজানের শুরুতেই একটি অদৃশ্য আর্থিক চাপে পড়েছে বলেই অনুমেয় হচ্ছে। রমজানে প্রতি বছর চাহিদা বৃদ্ধি পূর্বানুমেয় বাস্তবতা। এই মৌসুমি চাপ মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে শুল্ক হ্রাস, এলসি শর্ত শিথিলকরণ এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের বাফার স্টক গঠনের মতো নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। যদি আমদানি বা মজুতকৃত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বাজারে না পৌঁছায়, তবে নীতির সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। তখন তার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে স্থির আয়ের মধ্যবিত্তের ওপর।
যদিও নিম্নবিত্তের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকিযুক্ত পণ্য বা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে পণ্য বিতরণ কিছুটা সহায়তা দেয়। উচ্চবিত্ত মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে সক্ষম। কিন্তু মধ্যবিত্ত পড়ে যায় মাঝামাঝি এক শূন্যতায়। তাদের জন্য নেই সরাসরি ভর্তুকি, আবার বাজারদর বৃদ্ধিকে উপেক্ষা করার আর্থিক সক্ষমতাও নেই।
ফলে তারা ব্যয়ের পুনর্বিন্যাসে বাধ্য হয়। বাজার তালিকায় মাছ-মাংসের পরিমাণ কমে, ফলমূল কেনা সীমিত হয়, সেহেরি ও ইফতার হয় সাদামাটা। অনেক বাবা সন্তানের পাতে মাছ-মাংস তুলে দিয়ে নিজে ডাল-ভাতে সন্তুষ্ট থাকেন; অনেক মা নিজের অংশ কমিয়ে পরিবারের জন্য রাখেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ও সংকট কোনো পরিসংখ্যানের টেবিল বা সরকারি প্রতিবেদনে উঠে না এলেও, এটিই মধ্যবিত্ত জীবনের নীরব বাস্তবতা।
রমজানের খাদ্যসংস্কৃতিতে বৈপরীত্যও প্রকট। একদিকে রেস্টুরেন্টভিত্তিক ইফতার, বহুপদী আয়োজন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শনের সংস্কৃতি; অন্যদিকে মধ্যবিত্তের সংযমী টেবিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য এখানে মনস্তাত্ত্বিক চাপেও রূপ নেয়। মধ্যবিত্তের বড় সম্পদ আত্মসম্মান; অভাব প্রকাশ তাদের স্বভাব নয়। ফলে সংকট থাকে অন্তর্গত, অদৃশ্য অথচ গভীর।
এই পরিস্থিতিতে বাজারে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধি বন্ধ করতে হবে। কোথায় কত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, কত মজুত আছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে বাজারে অস্থিরতা কমে। ডিজিটাল স্টক মনিটরিং চালু থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন হয়। নিয়মিত নজরদারি ও মোবাইল কোর্টের কার্যকর তদারকি থাকলে ব্যবসায়ীরাও অনিয়মে যেতে সাহস পায় না। পাশাপাশি খোলাবাজারে বিক্রি বৃদ্ধি বিশেষত টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ন্যায্যমূল্যের বিক্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি বাজার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় কৃষক ও আড়তদারদের সঙ্গে সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুললে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমানো সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি সরবরাহ। রমজানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে বাজারে। তাই জ্বালানি খাতেও বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি।
সামাজিক দায়িত্বের জায়গাটিও এখানে বেশ সংকুচিত। রমজানকে কেন্দ্র করে যাকাত, ফিতরা ও দানের সংস্কৃতি সাধারণত চরম দারিদ্র্যের দিকে কেন্দ্রীভূত, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে মধ্যবিত্তের নীরব আর্থিক চাপ বিবেচনায় নেওয়ার মতো কাঠামো প্রায় অনুপস্থিত। পাড়া-মহল্লাভিত্তিক খাদ্য ভাগাভাগি, অপচয় কমানো, সমবায়ভিত্তিক কেনাকাটা (অর্থ্যাৎ কয়েকটি পরিবার বা একটি পাড়া-মহল্লার মানুষ একসঙ্গে দল গঠন করে সরাসরি পাইকার বা উৎপাদকের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে পণ্য কেনা, যাতে খুচরা দামের চেয়ে কম দামে পাওয়া যায়) প্রভৃতি উদ্যোগ মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে।
রমজানে মধ্যবিত্তের সংকট উপেক্ষিত থেকে যাওয়া কেবল একটি শ্রেণির আর্থিক কষ্ট নয়; এটি পুরো সমাজের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়। প্রশাসন, শিক্ষা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও বেসরকারি খাতের মূল চালিকাশক্তি এই মধ্যবিত্ত। তাদের নীরব অস্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। মধ্যবিত্তের সংকটকে গুরুত্ব না দিলে সামাজিক অসন্তোষ ও কাঠামোগত দুর্বলতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই মধ্যবিত্তের নীরব সংকটকে দৃশ্যমান করার পাশাপাশি নীতিগত সংবেদনশীলতাও সমানভাবে জরুরি। এতে কেবল নীতিনির্ধারকই নয়, সমাজের সচেতন অংশকেও ভূমিকা রাখতে হবে। রমজান সংযম ও সমতার শিক্ষা দেয়; সেই শিক্ষা বাস্তবে প্রতিফলিত হলে তবেই এ মাস সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।
পবিত্র এই মাস যেন কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাতে প্রাচুর্যের প্রদর্শনী না হয়ে প্রত্যেক পরিবারের জন্য মর্যাদার সঙ্গে উদযাপনযোগ্য হয়ে ওঠে, সেই প্রত্যাশাই থাকুক।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এমএ