নতুন সরকারের শপথ সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতার পর্দা নেমে এখন শুরু বাস্তবতার অধ্যায়। ক্ষমতার পরিবর্তনকে ঘিরে যে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সঞ্চালন গত কয়েক মাসে গড়ে উঠেছিল, শপথের মাধ্যমে তা নতুন কাঠামো পেল। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনপর্বের অবসান, অন্তর্বর্তী অনিশ্চয়তা এবং অবশেষে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নিরঙ্কুশ জনরায়। এই ধারাবাহিকতা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। দিল্লি সতর্ক পুনর্বিন্যাসে, ইসলামাবাদ প্রকাশ্য শুভেচ্ছায়, এই দুই প্রবাহের মাঝখানে এখন দায়িত্বশীল সরকার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা।
ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদকীয়তে বিএনপির বিজয়কে সম্ভাব্য স্থিতিশীলতার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে যে ভাষ্য দেওয়া হয়েছে, তা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং বাস্তববাদী স্বীকৃতি। বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে এবং সেই বাস্তবতার সঙ্গে কাজ করাই হবে দিল্লির কৌশল। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখেছে ভারত। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জঙ্গিবাদ দমন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহযোগিতা,সব ক্ষেত্রেই ঘনিষ্ঠতা ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি কখনো একক নির্ভরতায় স্থায়ী হয় না।
অন্তর্বর্তী সময়ের অস্থিরতা দিল্লিকে বুঝিয়েছে, বহুমাত্রিক যোগাযোগ ছাড়া স্বার্থরক্ষা সম্ভব নয়। ফলে বিএনপির সঙ্গে নীরব সমন্বয় ছিল কৌশলগত অভিযোজন, আকস্মিক মোড় নয়। দিল্লির দৃষ্টিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন নিরাপত্তা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে অতীতের অভিজ্ঞতা এখনো প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে না- এই নিশ্চয়তা ভারতের কাছে মৌলিক। পাশাপাশি তৃতীয় শক্তির কৌশলগত প্রভাব সীমিত রাখা, বিদ্যমান যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, এবং জনপরিসরে উগ্র ভারতবিরোধী বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ, এসবই অলিখিত সীমারেখা। শপথ অনুষ্ঠানে ওম বিড়লা ও বিক্রম মিশ্রির উপস্থিতি প্রতীকী হলেও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। তা হলো, সম্পর্ক বজায় থাকবে, তবে নিরাপত্তা প্রশ্নে আপস নয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন-এর সম্পাদকীয় ভিন্ন সুরে উচ্চারিত হয়েছে। সেখানে বিএনপির বিশাল জনরায়কে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়েছে, এখনই শুরু আসল পরীক্ষা। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে ব্যর্থ হলে ‘জনগণের ক্রোধের মুখোমুখি হতে হবে, যেমনটি হাসিনার আমলে হয়েছিল’। এই তুলনা কেবল বিশ্লেষণ নয়, এর মধ্যে রয়েছে প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা। যেন বলা হচ্ছে, জনরায় অস্থায়ী। ব্যর্থতা হলে রাজনৈতিক স্থিতি ভেঙে পড়তে পারে।
তরুণ ভোটারদের সম্ভাব্য প্রতিবাদের ইঙ্গিত দিয়ে যে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, তা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সম্ভাবনাকে সামনে এনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপও সৃষ্টি করে। ডনের ভাষ্যে আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে পুনর্বাসনের আহ্বানও এসেছে। গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির এই বক্তব্য নীতিগত শোনালেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষণীয় নয়। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার সঙ্গে দূরত্বে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা অতিমাত্রায় সক্রিয়তা দেখিয়েছে।
এসবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নামে ওই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক উচ্চপদস্থদের ঘনঘন বাংলাদেশ সফর, যৌথ সামরিক মহড়া, সামরিক বিমান ক্রয় আলোচনা, উচ্চ শিক্ষায় বৃত্তি প্রদান ঘোষণা এবং দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব কেবল সৌহার্দ্যরে বহির্প্রকাশ ছিল না, ছিল প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য গভীর মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ। এ সংকটকে ঘিরে পাকিস্তানের অবস্থান প্রায়ই আবেগঘন ছিল, কিন্তু বাস্তব সহায়তা সীমিত। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েনকে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। ফলে নতুন সরকারের প্রতি ইসলামাবাদের উষ্ণতা নিছক শুভেচ্ছা নয়, এর পেছনে কৌশলগত হিসাব রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বাস্তবতা স্পষ্ট। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নদী-ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত সহযোগিতা বহুমাত্রিক এবং অর্থনীতির বর্তমান চাপে অপরিহার্য। বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষণ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি নির্ভরতা, তরুণ বেকারত্ব, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতায় আবদ্ধ।
অতীতের ক্ষত এখনো সম্পূর্ণ নিরাময় হয়নি। ফলে সম্পর্ক উন্নয়ন সম্ভব হলেও তা আবেগের নয়, স্বার্থের কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এখানে তৃতীয় একটি মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া এখন বহিরাগত শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় যোগাযোগপথ কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে সম্ভাবনার কেন্দ্র করেছে। আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেও পরিণত করেছে।
ফলে যে কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রতিফলিত হয়। এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে সংযত, বহুমাত্রিক ও স্বার্থনির্ভর। শপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শেষ হয়েছে। এখন শুরু নীতির ধারাবাহিকতার পরীক্ষা। দিল্লির নিরাপত্তা-রেখা অতিক্রম করা যাবে না, ইসলামাবাদের প্রত্যাশার ফাঁদেও পা দেওয়া যাবে না। অভ্যন্তরীণ জনবয়ানে উগ্রতা প্রশ্রয় দিলে আঞ্চলিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার অতিরিক্ত সমঝোতার ইঙ্গিত দিলে সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ভারসাম্য রক্ষা তাই কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দায়িত্বও। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্নেও সংযম প্রয়োজন। প্রতিশোধমূলক রাজনীতি স্থিতিশীলতা আনে না, আবার দায়মুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে, বহিরাগত ইঙ্গিতে নয়।
সবশেষে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গণরায়। দিল্লি কিংবা ইসলামাবাদ কেউই এই ম্যান্ডেটের বিকল্প নয়। নীরব সমীকরণ সাময়িক সুবিধা দিতে পারে। প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা সাময়িক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে ঢাকার নীতির স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার ওপর। বাংলাদেশ কোনো শক্তির কৌশলগত পরিসর নয়। এটি নিজস্ব স্বার্থনির্ভর রাষ্ট্রনীতি অনুসরণের সক্ষম সার্বভৌম রাষ্ট্র। শপথের পরের এই অধ্যায়ে সরকারের সামনে একটিই পথ-আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতা, প্রভাবের পরিবর্তে ভারসাম্য, এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া। তবেই নতুন অধ্যায়টি কেবল ক্ষমতার নয়, নীতিরও পুনর্জন্ম হয়ে উঠতে পারে।
কেকে/এমএ