শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম কর্মদিবস ছিল গতকাল বুধবার। দিনটি ঘিরে রাজধানী ঢাকা ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়জুড়ে ছিল উৎসবমুখর ও কর্মচঞ্চল পরিবেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে বিকালে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সচিবালয়ে। বৈঠকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রথমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রীসহ অধিকাংশ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজ নিজ দপ্তরে যোগ দেন। সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিতি ও কুশল বিনিময় করেন। অনেক মন্ত্রণালয়ে নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করা হয়। বিভিন্ন দপ্তর, বিভাগ ও সংস্থার প্রধানরাও উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা জানান।
মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা তাদের প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, অর্থ ও পরিকল্পনা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমি, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, ধর্ম ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ছিল কর্মব্যস্ততা।
নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম কর্মদিবসকে কেন্দ্র করে সচিবালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, কর্মকর্তা, নিরাপত্তা সদস্য ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে ভেতরে যানবাহন চলাচলে কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়। পার্কিং এলাকাও ছিল সরগরম।
নতুন সরকারের তিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সচিবালয়ে।
গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অগ্রাধিকার তিনটি হলো, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
মন্ত্রীদের স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
মন্ত্রীদের যে কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শক্ত অবস্থানের’ ওপর জোর দিয়ে রোজায় দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের যে এত বিপুল জনসমর্থন, সেটার জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, জনগণ আমাদের কাছ থেকে সুশাসন ও জবাবদিহিতা চায়। সে ক্ষেত্রে আমরা স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্বে আছি, তারা যেন যে কোনো ধরনের প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করি। বিশেষ করে দুর্নীতির প্রশ্নে যেন আমাদের একটা শক্ত অবস্থান থাকে।’
গতকাল বেলা তিনটার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক শুরু হয়। এরপর সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথামাফিক সরকারের প্রথম দিনে একটি মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে হয়। বৈঠকে মন্ত্রিসভার সব সদস্য বসেছিলেন। বৈঠকে উপদেষ্টারাও ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের কিছু অনুশাসন দিয়েছেন। সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে। সেটি পরে জানানো হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা রয়েছে। এগুলো হলো অগ্রাধিকার।’
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হচ্ছে পবিত্র রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বিশেষ করে তারাবিহ ও ইফতারের সময়। মূলত এই তিন বিষয় অগ্রাধিকারে এসেছে। এগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কর্মপরিকল্পনা দু-এক দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের সব সচিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের বলেছেন জনগণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। সুতরাং সংবিধান ও আইনবিধি অনুযায়ী ওই নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচিবরা আন্তরিক হবেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
১৮০ দিনের পরিকল্পনা দেবে সরকার
‘সরকারের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে শিগগির একটি ১৮০ দিনের রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ রোডম্যাপ দেবেন।’ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত কাজ শুরু করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে। এ সময়ে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
এর আগে নিজ দপ্তরে যোগ দিয়ে যুব এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনৈতিকমুক্ত করতে কাজ করবে সরকার।’
পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী সরকার পরিচালনায় কাজ করব।’
কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষিকার্ড বিতরণ করা হবে।’
শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘আমার ওপর প্রধানমন্ত্রীর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে যাব। সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় যারা ১৭ বছর ধরে জীবন দিয়েছে তাদের কথা স্মরণে রেখেই কাজ করব। চ্যালেঞ্জ আছে পাহাড় সমান, মানুষের প্রত্যাশা তা পূরণে নিরন্তরভাবে কাজ করে যাব।’
বিমানের টিকেট নিয়ে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেটের বিষয়ে বিমান প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘বিমানের টিকেট নিয়ে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ করব। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করব। জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করব। সম্প্রীতির পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ার লক্ষ্যে কাজ করব।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ডাক্তারদের ৯টার অফিস ১২টায় গেলে হবে না। সাত দিনের মধ্যে ভিজিট শুরু করব হাসপাতালগুলোতে। এক মাসের মধ্যে ডাক্তারদের কর্মস্থলে সঠিক সময়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করব।’
কেকে/এলএ