রমজান মাস এলেই অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা যেখানে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন, সেখানে গত পাঁচ বছর ধরে এক ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করে চলেছে জেসি এগ্রো ফার্ম। রমজান মাসজুড়ে ১০ টাকা লিটারে গরুর খাঁটি দুধ বিক্রি করছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রৌহা গ্রামের জেসি এগ্রো ফার্ম। নামমাত্র মূল্যে দুধ পানের সুযোগ পেয়ে খুশি এলাকার মানুষ। ১০ টাকা লিটারে জেসি এগ্রো ফার্মের খামারে উৎপাদিত ৩ টন দুধ বিক্রি করা হব।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফ্রেব্রুয়ারি) সকালে রৌহা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত জেসি এগ্রো ফার্মে এই দুধ বিক্রির কার্যক্রম শুরু করা হয়।
রমজান মাসজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিদিন লিটার ১০ টাকা দামে দুধ বিক্রি করা হবে। একজন ব্যক্তি দৈনিক সর্বোচ্চ এক লিটার দুধ কিনতে পারবেন। এভাবে ১০ টাকা লিটার দরে গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও তার খামার থেকে উৎপাদিত সব দুধ বিক্রি করছে জেসি এগ্রো ফার্ম।
জানা যায়, পাঁচ বছর আগে জেসি এগ্রো ফার্ম নামে খামার গড়ে তোলা হয় রৌহা গ্রামে। সেই খামারে দুগ্ধ ও মোটাতাজাকরণের দেড় শতাধিক গরু রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৮টি গরু দুধ দিচ্ছে। খামার থেকে প্রতিদিন সকাল বিকাল ৮০-৯০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ রমজান মাসে অতিরিক্ত দামের কারণে দুধ কিনতে পারেন না। তাদের কথা ভেবেই খামারটি শুরু করার পর থেকেই প্রতিবছর রমজান মাসে দুধ ১০ টাকা লিটারে বিক্রি করে আসছে। যে কেউ জেসি এগ্রো ফার্মের খামার থেকে ১০ টাকা লিটার দরে সর্বোচ্চ এক লিটার দুধ কিনতে পারবেন।
বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, এলাকার দরিদ্র মানুষ প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ, জগ, মগসহ নানা পাত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন দুধের জন্য। বাজারে যেখানে গরুর দুধ বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা লিটার। সেখানে খামারে উৎপাদিত এক লিটার খাঁটি দুধ মিলছে মাত্র ১০ টাকায়। তাইতো নামমাত্র টাকায় দুধ কিনতে জেসি এগ্রো ফার্ম খামারে মানুষ ভিড় করছেন।
দুধ নিতে আসা পার্শ্ববর্তী নাহিরাজপাড়া গ্রামের কামাল হোসেন বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে রোজার সময় এখান থেকে ১০ টাকা কেজি ধরে দুধ নিতাছি। সকালে বাড়ি থেকে আসছি ২০ টাকা দিয়া এক লিটার দুধ কিনতে। আমরা অনেক খুশি, কারণ আমাদের মতো গরিব মানুষের ১০০ টাকা লিটার করে বাজার থেকে দুধ কিনে খাওয়া সম্ভব না।’
নিয়ামতপুর ইউনিয়নের দেওপুর গ্রামের কৃষক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বাজারে সব কিছুরই মূল্য অনেক। রমজানে ১০০ টাকা লিটার করে দুধ কিনে খাওয়া আমাদের সম্ভব না। জেসি এগ্রো ফার্ম গত পাঁচ বছর ধরে ১০ টাকা করে দুধ দিতেছে আমাদের। এই দুধ দিয়েই আমরা সেহরি খাব। আমাদের সকল বিপদেই জেসি এগ্রো ফার্ম পাশে থাকেন।’
দুধ নিতে আসা নিয়ামতপুর ইউনিয়নের রৌহা গ্রামের গৃহবধূ নূর আগুরা আক্তার বলেন, ‘রমজানে দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। এর মধ্যে ৯০-১০০ টাকায় লিটার দুধ কিনা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। ১০ টাকা লিটারে দুধ কেনার সুযোগ করে দেয়ায় আমরা দুধ খেয়ে রোজা রাখতে পারছি।’
রৌহা গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলাম এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘রমজানে দুধের একটি চাহিদা থাকে। তাই এ সময় দুধের দামও বেশি থাকে। তাই প্রয়োজন হলেও অনেকের দুধ কেনার সামর্থ্য থাকে না। কিন্তু জেসি এগ্রো ফার্ম গত পাঁচ বছর ধরে এলাকার মানুষদের জন্য ভালো একটা ব্যবস্থা করেছে, যার ফলে রমজানে দুধ নিয়ে অন্তত আমাদের বাড়তি কোনো চাপ থাকে না। আমরা এলাকাবাসী তাদের নিয়ে গর্ব করি।’
জেসি এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ রিয়াদ জানান, এক লিটার কিংবা দুই লিটার নয়। পবিত্র রমজান উপলক্ষে দরিদ্র মানুষের মধ্যে রোজার প্রথম দিন থেকে নামমাত্র মূল্যে তিন হাজার লিটার দুধ বিক্রি করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা মিটিয়ে চড়ামূল্য দুধ কেনা দরিদ্র মানুষের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। তাই কম দামে দুধ পেয়ে খুশি এলাকার মানুষ। প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা করে। তবে কারও কাছে টাকা না থাকলে তাকেও ফিরিয়ে দেয়া হয় না।
উল্লেখ, মোজেসি এগ্রো ফার্ম একটি মানবকল্যাণ ফাউন্ডেশন করে এলাকার হতদরিদ্র, প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছে। মানুষের যেকোন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে তাদের সহযোগিতা করে আসছে। এর আগে ২০২৩ সালে দুধ ও মাংস উৎপাদনের জন্য ডেইরি আইকন সম্মাননা পেয়েছিল জেসি এগ্রো ফার্ম।