নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বিতর্কের জন্ম দিলেন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা অর্থকে তিনি চাঁদা না বলে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা কল্যাণ তহবিল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করায় তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল, পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। মন্ত্রীর এই মন্তব্যের আপত্তি জানিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—আইনি কাঠামোর বাইরে কোনো আর্থিক লেনদেনকে সমঝোতা বলা যায় না। এটা স্পষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতি।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন—নতুন সরকারের শুরুতেই মন্ত্রীর এই মন্তব্য পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয় সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।’
রবিউল আলম আরো বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অনেক সংস্থা আছে। তারা এটা সমঝোতার ভিত্তিতে করে (টাকা তোলে)। সেখানে আবার প্রাধান্য পায় যখন যার প্রভাব থাকে, এমন মালিকদের বা দলের প্রভাব থাকে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শ্রমিক সংগঠনের একটা আধিপত্য থাকে। কিন্তু এটা চাঁদা আকারে আমাদের কাছে দেখার সুযোগ হচ্ছে না। কারণ তারা সমঝোতা ভিত্তিতে করছে।’ তবে সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা চাঁদাটা বাড়তি কি না তা সরকার খতিয়ে দেখবে বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী রবিউল আলম।
এদিকে সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী যেটিকে সমঝোতা বলছেন, তা বাস্তবে চালকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি পদ্ধতি। কোনো চালক নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালাতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট সংস্থাকে টাকা দিতেই হয়। একে সমঝোতার মোড়ক দেওয়া মানে একটি অনিয়মকে বৈধতার ভাষা দেওয়া। এই অবৈধ লেনদেনের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বাসভাড়া বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এই অলিখিত চাঁদা, আর পণ্যবাহী ট্রাক থেকে এভাবে টাকা আদায়ের ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এই অর্থের বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তাদেরই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মন্ত্রী নিজেই উল্লেখ করেছেন যে—যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আধিপত্য থাকে। এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কি এই অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ক্যাডারদের পৃষ্ঠপোষকতার একটি মাধ্যম? যদি তা না হয়, তাহলে এর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।’
তাসনিম জারা বলেন, ‘রাস্তায় অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা তোলা বন্ধ করতে হবে। যদি মালিক বা শ্রমিক সমিতির কল্যাণ তহবিলের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে তা আনুষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা উচিত। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অথবা বার্ষিক রেজিস্ট্রেশন ফি-র সঙ্গে যুক্ত করে এই অর্থ আদায় করা যেতে পারে।’
তাসনিম জারা বলেন, ‘সড়কে যে কোটি কোটি টাকা তোলা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ অডিট নিশ্চিত করতে হবে এবং এই অর্থ কার কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে, তা প্রকাশ করতে হবে। এই অর্থ সাধারণ চালক বা মালিকের ব্যক্তিগত অর্থ নয়, বরং যাত্রী ও ভোক্তাদের কাছ থেকেই আসে। তাই সরকারের দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং অনিয়মকে ‘অলিখিত বিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া।’
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান। গতকাল বৃহস্পতিবার তার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেন—দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মহাসড়কে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা আদায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে যাচাই করে দেখেছি দেশের সকল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ক্ষমতাসীন দল বা শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মদদে এই চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে চলছে যুগের পর যুগ ধরে। এই পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আর এসব অর্থের ১৫-২০% ও যদি সাধারণ শ্রমিকদের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো তাহলে দেশের শ্রমিকদের বহু সমস্যার নিরসন ঘটতো, যেমন ধরুন শ্রমিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, কিম্বা তাদের সন্তানদের বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাঠানো অথবা পেনশন।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু বাস্তবে যে সেটা হয় না। সেটা সদ্য মন্ত্রী হওয়া রবিউল সাহেব সম্ভবত জেনেও না জানার ভান করছেন। আর সে কারণেই তিনি এমন অর্বাচীনের মতো মন্তব্য করেছেন যে—‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়।’
কেকে/এজে