একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হলো—দেশের সাধারণ জনগণ। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক ধরনের অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে। উন্নয়নের চাকচিক্যময় পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর ক্ষতগুলো আজ প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বেকারত্ব, আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। একটি জাতীয় উপ-সম্পাদকীয়তে আজ সেই সমস্যাগুলোর নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ প্রয়োজন, যা আমাদের জাতীয় অগ্রগতির পথে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের নাম হলো বাজার পরিস্থিতি। প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল আর সবজির দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরে শক্তিশালী ‘বাজার সিন্ডিকেট’ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটছে। এই সিন্ডিকেটের হাত এতই লম্বা যে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তাদের প্রভাব দৃশ্যমান। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের যে ধরনের কঠোর তদারকি বা মনিটরিং প্রয়োজন ছিল, তার অনুপস্থিতি অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। টিসিবির ট্রাকের পেছনে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি প্রমাণ করে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও সাধারণের পাতে দুবেলা অন্ন জোটানো আজ কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের এই অগ্নিমূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকারত্বের অভিশাপ। একটি দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ যখন কর্মহীন হয়ে অলস সময় কাটায়, তখন তা কেবল পারিবারিকভাবে নয়, জাতীয়ভাবেও বড় বিপর্যয়। প্রতিবছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং নতুন কলকারখানা স্থাপনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। শুধু দেশেই নয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দালালের দৌরাত্ম্য এবং অভিবাসন ব্যয়ের উচ্চহার তরুণদের স্বপ্নকে ফিকে করে দিচ্ছে। কর্মসংস্থানহীন এই প্রবৃদ্ধি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয় ব্যাংকিং খাতকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের আর্থিক খাত এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ব্যাংকগুলোতে প্রকট হয়ে উঠেছে তারল্য সংকট। এর মূল কারণ হলো ‘খেলাপি ঋণ’ সংস্কৃতি। বড় বড় শিল্প গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছে না, উল্টো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেই ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা। আর্থিক খাতে সুশাসনের এই অভাব কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই নয়, বরং পুরো দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং মুদ্রাস্ফীতিকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। ব্যাংকিং খাতে সংস্কার না আনলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি কোনোভাবেই মজবুত করা সম্ভব নয়।
শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য হলো—নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট আমাদের উৎপাদন খাতকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। কলকারখানায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাস থাকে না, আর লোডশেডিংয়ের কারণে মেশিনের চাকা বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা হারাচ্ছি। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, যা আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, তা আজ জ্বালানি সংকটের কারণে হুমকির মুখে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে।
জাতির শিড়দাড়া তৈরি করে শিক্ষা। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে? মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের অসামঞ্জস্যতা শিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের চেয়ে মুখস্থ বিদ্যার প্রাধান্য মেধাবী তরুণদের নিরুৎসাহিত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ‘মেধা পাচার’ বা ব্রেইন ড্রেইন-এর ওপর। দেশের সেরা মেধাবীরা উন্নত জীবনের আশায় এবং দেশে যোগ্যতার মূল্যায়ন না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশ তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হারালোও রাষ্ট্র এই রক্তক্ষরণ বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলতে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সমাজে যখন দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার বাড়ে এবং অপরাধী রাজনৈতিক বা পেশিশক্তির জোরে আইনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ বিচারালয়ের ওপর আস্থা হারায়। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলার জট সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার সুনিশ্চিত করার পথে বড় বাধা। নারীর নিরাপত্তা থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনি, সবই এক অস্থির সমাজকাঠামোর বহির্প্রকাশ। অপরাধীর শাস্তি যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
পরিশেষে আসে পরিবহন খাতের সীমাহীন বিশৃঙ্খলার কথা। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর দেখি। যাতায়াত ব্যবস্থায় চরম অব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালকদের দাপটে রাস্তাগুলো আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিবহন সিন্ডিকেটের প্রভাবে সাধারণ যাত্রীরা জিম্মি হয়ে আছে। মেগাসিটিগুলোতে যানজট কেবল কর্মঘণ্টাই নষ্ট করছে না, বরং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যেরও চরম ক্ষতি করছে। একটি আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
উপরোক্ত এই বহুবিধ সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটিকে এড়িয়ে অন্যটির সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে এই পঙ্কিলতা থেকে দেশকে উদ্ধার করতে। দুর্নীতিবাজ ও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ফিরিয়ে আনতে হবে শৃঙ্খলা। তরুণদের জন্য তৈরি করতে হবে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার পরিবেশ। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল বড় বড় দালানকোঠা বা রাস্তায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবনের গুণগত পরিবর্তন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সকল বাহ্যিক উন্নয়নই অর্থহীন হয়ে পড়বে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে আজই আমাদের এই সংকটগুলো মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ ও সাহসী হতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোগত চকমকিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা প্রতিফলিত হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর। বাজার সিন্ডিকেট দমন, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি। দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যদি একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়, তবে অর্জিত সাফল্যগুলো টেকসই হবে না। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, জনমানসের এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ দূর করতে হলে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হতে পারে উত্তরণের একমাত্র পথ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কেকে/এজে