রোজাদারদের কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় রেখে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। এটির কার্যকর করা গেলে জনসাধারণের ভোগান্তি অনেকটা কমে আসবে। কিন্তু একই সঙ্গে বিবেচনায় রাখা দরকার শিল্প কারখানাগুলোর কথা বিগত দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতায় সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প খাত।
শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতাই নয়—গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাব এই খাতকে ক্রমশ ভঙ্গুর করেছে। যার ফলশ্রুতিতে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছে অসংখ্য শ্রমিক। এই বাস্তবতায় শুধু রমজান উপলক্ষে বাসা বাড়িতেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি সারা বছরই অর্থনীতিকে গতিশীল ও ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনঃস্থাপন করতে নতুন সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ জরুরি, তারই একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা হতে পারে শিল্প কারখানগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। অর্থের প্রবাহ সহজতর নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া।
বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তাই স্বল্পমেয়াদি হলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর সমাধান দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শিল্প খাত আরও দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব। বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোয় যেমন উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে রপ্তানিপণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্পোদ্যোক্তা নতুন রপ্তানি কার্যাদেশ গ্রহণ বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে প্রায় দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে আসে দুই হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে গ্যাসের সমস্যা তাদের জন্য মহামারি আকার ধারণ করেছে। গ্যাস না থাকায় কারখানা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে বলা চলে। তবে কিছু কিছু ইউনিট ডিজেল দিয়ে চালানো হচ্ছে। এতে গ্যাসের মূল্যের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ অর্থ গুনতে হচ্ছে। প্রতিদিন বয়লার এবং জেনারেটর চালানোর জন্য ১৬ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সেখানে গ্যাস না থাকায় এক দিনের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প কারখানাগুলোকেও বিশেষ বিবেচনায় রাখা উচিত। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার জন্য গ্যাসের নতুন সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রমঘন পোশাক ও বস্ত্র শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিতাস গ্যাসের নতুন সংযোগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কর্তৃক যাচাই-বাছাই কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে যাতে করে কারখানাগুলো সময়মতো উৎপাদন শুরু করতে পারে। কম লোড বৃদ্ধির আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়, যা ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে যেতে সাহায্য করবে।
ধামরাই ও মানিকগঞ্জের মতো যেসব এলাকার গ্যাস পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যায়, সেখানে অন্তত তিন-চার পিএসআই চাপ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই ক্ষয়িষ্ণুতার হাত থেকে বাঁচবে দেশের শিল্প কারখানা।
কেকে/এজে