রাত যত গভীর হয়, চারপাশে নেমে আসে নীরবতা। দিনের আড্ডা, রাস্তাঘাটের গুঞ্জন, গ্রামের মানুষজন—সব মিলিয়ে স্তব্ধ। কিন্তু দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি গ্রামে ভাঙা টিনের একটি ঘরে তখনও ঘুম আসে না দুইটি ক্লান্ত চোখে। টিনের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে শীতের বাতাস, বর্ষায় টুপটাপ পানি পড়ে মাচার ওপর। ভিজে যায় বিছানা, কেঁপে ওঠে বৃদ্ধ দম্পতির শরীর।
এই ঘরেই দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বসবাস করছেন মো. রমজান আলী ও তার স্ত্রী সাহিদা বেগম। মো. রমজান আলী একসময় দেশের সেবায় আনসার বাহিনীতে কাজ করেছেন। জীবন তাদের অনেক কিছু দিয়েছে—কর্তব্য পালন, দেশ সেবা, সম্মান। কিন্তু কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর জীবন যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরের কষ্ট, ভাঙা ঘর, অনিশ্চিত খাবার—এগুলোর মধ্যেই কাটছে তাদের শেষ বয়স।
খামারের মালিক তাহেরা আজিজ মানবিক কারণে তাদের থাকতে দিয়েছেন। তবে ঘরটি বসবাসের জন্য কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। বৃষ্টির দিনে পানি ঢোকে, শীতে কাঁপা ঠান্ডা, আর দিনের বাকি সময় ঘরের ফাঁক, ভাঙা মাচা ও ক্ষীণ দেওয়ালই তাদের জীবনযাপনের সাক্ষী। রমজান আলী প্রতিদিন হাতে কোদাল নিয়ে খামারের কাজে নামেন। গরু, মুরগি ও খামারের নিত্যপরিচ্ছন্নতা—এই কাজই এখন তার একমাত্র জীবিকা। তবে মাস শেষে পারিশ্রমিক হিসেবে পান মাত্র এক হাজার টাকা।
এই সামান্য আয়ে চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুই বেলা খাবারও ঠিকমতো জোটে না। বড় ছেলে শাহাজাহান আলী পাকেরহাট বাজারে ফুটপাতে বাদাম বিক্রি করেন। সারাদিন রোদে পুড়ে ও ধুলো মেখে যা আয় হয়, খরচ বাদে হাতে থাকে মাত্র ৩০০-৪০০ টাকা। ছয় সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে বাবা-মায়ের জন্য আলাদা করে কিছু করার সামর্থ্য নেই তার। অভাব যেন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
রমজান আলী কোনো দান বা বিশেষ সুযোগ চান না। তিনি শুধু চান, এক টুকরো নিরাপদ ঘর, যেখানে বৃষ্টি নামলেও বিছানা ভিজবে না, শীত আসলেও শরীর কাঁপবে না।
রমজান আলী কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলেন, ‘১৬ বছর ধরে এই খামারে আছি। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, শীতে শরীর কাঁপে। আর কিছু চাই না—শুধু ঘুমানোর মতো একটি ছাদ চাই।’
পাশে বসে সাহিদা বেগমের চোখ ভিজে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজের কিছু নেই। মানুষের জায়গায় আছি। এই শেষ বয়সে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চাই।’
খামারের মালিক তাহেরা আজিজ বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা তাদের এখানে থাকতে দিই। কিন্তু একজন সাবেক আনসার সদস্যের এই জীবন সত্যিই মর্মন্তুদ। তাদের জন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া উচিত।’
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই দম্পতিকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হোক। কারণ একটি ঘর শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়—এটি মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতীক।
আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্য আবু খায়ের বলেন, ‘আমি সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে তাদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হবে। ইনশাআল্লাহ।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তমিজুল ইসলামও বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে তাদের পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রমজান আলী ও সাহিদা বেগমের এই দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন জাগে—যে মানুষটি একসময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেছেন, তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় কি?
ভাঙা টিনের নিচে প্রতিদিন জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস। শেষ বয়সে শুধু একটি নিরাপদ ঘর—এটিই তাদের চাওয়ার শেষ সীমা। বৃষ্টিতে ভিজা, শীতে কাঁপা—এই জীবন কতদিন চলবে? সমাজের, রাষ্ট্রের ও স্থানীয় প্রশাসনের নজর কত দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছাবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
কেকে/এমএ