নির্বাচনে বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা সহজ, কিন্তু সেই আস্থাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। নতুন সরকারের সামনে এখন ঠিক সেই পরীক্ষাই। একদিকে আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে অর্থনীতির চাপ। দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত, দৃশ্যমান ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার তথ্য উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুদিনে ৩০ জেলায় সহিংসতা, প্রাণহানি ও শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে লুট হওয়া ১৩ হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, বড় দল মানেই বড় সংগঠন, বিস্তৃত তৃণমূল কাঠামো। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত সব সময় মাঠপর্যায়ে একইভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ চাঁদাবাজি, দখল বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়লে তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই পড়ে। তাই অপরাধ দমনে শূন্য সহনশীলতার নীতি শুধু ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও নিশ্চিত করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান এই বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
তবে আইনশৃঙ্খলা একমাত্র সংকট নয়। অর্থনীতির চিত্র আরও কঠিন। প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণ, যার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক দায়Ñ এই ভার নিয়ে সরকারকে পথ চলতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে। জানুয়ারিতে তা ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ লাইনের দুর্বলতা এবং টাকার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে চাপে ফেলেছে।
অর্থনীতিবিদরা বারবার তিনটি অগ্রাধিকার উল্লেখ করছেন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা। এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিনিয়োগ স্থবির থাকলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, আর কর্মসংস্থান না বাড়লে দারিদ্র্য কমবে না। কিন্তু বিনিয়োগ টানতে হলে স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যাংক খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে বিপুল অর্থ লুটপাট হয়েছে এবং মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ খেলাপি। দুর্বল পুঁজিবাজারের কারণে বড় শিল্পঋণের চাপ ব্যাংকের ওপর এসে পড়েছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, শক্ত আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রাস্তায় নিরাপত্তা এবং বাজারে স্থিতি। একটিকে অবহেলা করলে অন্যটি সামাল দেওয়া যাবে না। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া বিনিয়োগ আসবে না, আর অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া সামাজিক শান্তিও টিকবে না। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমান প্রমাণ। জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছে; এখন সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করার পালা।
নতুন সরকারের প্রথম কাজ আস্থা ফিরিয়ে আনা। আইনশৃঙ্খলায় শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও দলীয় পরিচয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং কার্যকর পুলিশিং এখন জরুরি। অর্থনীতিতে অগ্রাধিকার তিনটি: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা।
নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মুদ্রা ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা এবং খেলাপি ঋণ কমানো প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও অর্থনীতি পরস্পর নির্ভরশীল। একটিকে উপেক্ষা করলে অন্যটি টিকবে না। দ্রুত, সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই পারে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে।
কেকে/ এমএস