ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই সফল বলেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, অংশগ্রহণ ছিল, ফল ঘোষণায় তুলনামূলক গতি ছিল। কিন্তু একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট সেই সাফল্যের আড়ালে এক জটিল ও অস্বস্তিকর প্রশ্নমালা রেখে গেছে। সংখ্যায় বড় ব্যবধান, ‘হ্যাঁ’-এর নিরঙ্কুশ জয়, গেজেট প্রকাশ, সব মিলিয়ে যেন একটি পরিসংখ্যানগত সাফল্যের গল্প। অথচ বাস্তবতার ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এই গণভোট গণতান্ত্রিক চর্চার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, নৈতিক বিতর্ক ও রাজনৈতিক অস্বস্তির এক সমাহার।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন। ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৮০ লাখ ৪২ হাজার ৩৪১ জন। অর্থাৎ অংশগ্রহণ ৬১.১১ শতাংশ। প্রায় ৩৯.৮৯ শতাংশ ভোটার অংশ নেননি। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব, প্রবাস বা মৃত্যুজনিত কারণ বাদ দিলেও প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষের অনুপস্থিতি থেকে যায়। সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই হার গ্রহণযোগ্য ধরা যেতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রশ্নে, যেখানে সংবিধানের মূলনীতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচারব্যবস্থা, এমনকি রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা, সেখানে কি কেবল উপস্থিত ভোটারের অর্ধেকের চেয়ে একজন বেশি ‘হ্যাঁ’ বললেই সেটি অকাট্য গণরায় হয়ে যায়? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারি হিসাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখের বেশি, ‘না’ প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখের মতো; বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখের বেশি ব্যালট। শতকরা হিসাবে ‘হ্যাঁ’ প্রায় ৬২ শতাংশ, ‘না’ প্রায় ২৯ শতাংশ। ব্যবধান বড়, এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু গণতন্ত্র কেবল ব্যবধানের খেলা নয়; এটি অংশগ্রহণের গভীরতা, বোঝাপড়ার মান ও প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নও। গণভোটের প্রশ্নপত্র ও ভাষা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। সংবিধান সংশোধন, ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্তি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে উভয়কক্ষের অনুমোদন এসব জটিল সাংবিধানিক ধারণাকে একত্র করে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর ঘরে সিল দিতে বলা হয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বড় অংশই যেখানে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিভ্রান্ত হয়েছেন, সেখানে স্বল্পশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানহীন ভোটারের কাছে এটি কতটা বোধগম্য ছিল?
ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে এক শ্রমজীবী মানুষের সরল প্রশ্ন ‘এই হ্যাঁ/না ভোটটা কী, দিলে কী হবে?’। এটি আসলে গণভোটের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি। অন্যত্র একজন ভোটার সাংবাদিককে বলেছেন, ‘মূর্খ মানুষ, কেমনে পড়ব?’ এই বেদনাবোধকে উপেক্ষা করে গণরায়ের মহিমা ঘোষণা করলে তা কাগজে-কলমে সত্য হতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক আত্মার সঙ্গে তার দূরত্ব থেকেই যায়। গণভোট তখন হয়ে ওঠে পরিমাণগত, কিন্তু গুণগতভাবে ফাঁপা। প্রক্রিয়াগত প্রশ্নও কম নয়। ‘হ্যাঁ’-এর পাশে টিক চিহ্ন, ‘না’-এর পাশে ক্রস চিহ্ন, এমন নকশা কি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবমুক্ত? আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসে টিক মানে সঠিক, ক্রস মানে ভুল। মানুষ সচেতনভাবে ভোট নষ্ট করতে চায় না; ফলে ক্রসকে অবৈধতার প্রতীক ভেবে দূরে সরে থাকা অস্বাভাবিক নয়। একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে চাইলে উভয় বিকল্পে একই ধরনের নিরপেক্ষ চিহ্ন ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। নির্বাচন কেবল ফল নয়, প্রক্রিয়ার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে।
আরও বিস্ময় জাগায় ফল ঘোষণার ধরন। সংসদীয় আসনের জয়-পরাজয়ে যখন জাতি মগ্ন, তখন গণভোটের ফলাফল দেরিতে আসে। প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা নিজেদের হিসাব নিয়ে চলে গেছেন; গণভোটের ব্যালট যেন পড়ে ছিল আলাদা এক অগ্রাধিকারের তালিকায়। পরে বিভিন্ন আসনে অস্বাভাবিক পরিসংখ্যান, কোথাও অস্বাভাবিক উচ্চ হার, কোথাও অতি নিম্ন অংশগ্রহণ, কোথাও প্রদত্ত ভোটের হার নিয়ে সংশোধন,এসব প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে, একই ভোটার তালিকায় অনুষ্ঠিত হলেও অংশগ্রহণের হার ভিন্ন কেন? এই ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, অনেকে নাকি শুধু গণভোটে ভোট দিয়েছেন, সংসদ নির্বাচনে নয়। প্রশ্ন হলো, কে কোন ভোট দিয়েছেন তা কর্তৃপক্ষ জানলেন কীভাবে? গোপন ব্যালটের নীতির সঙ্গে এই ব্যাখ্যার সামঞ্জস্য কতটা? আবার একই বক্তব্যে কখনো বলা হচ্ছে ব্যবধান সামান্য, কখনো বলা হচ্ছে গণভোটে বেশি অংশগ্রহণ, এই দ্বৈততা বিভ্রান্তি বাড়ায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো আঞ্চলিক ফলাফল। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ‘না’ জয়ী হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা, গোপালগঞ্জের তিন আসন, আরও কয়েকটি এলাকা। রাষ্ট্রব্যাপী ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে, ঠিক; কিন্তু যেসব অঞ্চলে স্পষ্টভাবে ‘না’ প্রাধান্য পেয়েছে, সেখানে সংস্কার কার্যত ‘চাপিয়ে’ দেওয়া হবে কি? গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়, কিন্তু সংখ্যালঘুর মতো উপেক্ষা করলে তা রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায় ‘না’-এর বার্তাকে গুরুত্বসহকারে রাজনৈতিক আলোচনায় না আনলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এখন প্রশ্নের আরেক স্তর-গণভোটের ফল কি সংসদকে বাধ্য করে? গেজেট অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হ্যাঁ’ এলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করবে। কিন্তু সাংবিধানিক নীতি স্পষ্ট: কোনো সংসদ পরবর্তী সংসদের সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে পারে না। সংসদ চাইলে পূর্ববর্তী আইন বাতিল করতে পারে। সেই হিসেবে, নতুন সংসদের হাতে জুলাই সনদের প্রস্তাব আংশিক বা সম্পূর্ণ সংশোধন কিংবা প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা রয়েছে।
অতএব গণভোট সরাসরি সংবিধান পরিবর্তন করেনি। এটি একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের দাবি তৈরি করেছে মাত্র। এই দাবি কতটা নৈতিক, কতটা আইনি, তা নির্ভর করবে সংসদের বিতর্ক, বিশেষজ্ঞ মতামত ও সর্বদলীয় আলোচনার ওপর। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব প্রস্তাব পাশ করানো যেমন গণতান্ত্রিক উদারতার পরিচয় নয়, তেমনি গণরায় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
এখানে আরেকটি সাংঘর্ষিক দিক আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের গৃহীত সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হবে না-এমন বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ আইনেও যেখানে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাগে, সেখানে সংবিধান সংশোধনের মতো মৌলিক বিষয়ে এই ধাপ বাদ দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? একদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা, অন্যদিকে তাকে এই প্রক্রিয়া থেকে কার্যত দূরে রাখা, এটি নীতিগত অসামঞ্জস্য তৈরি করে।
সব মিলিয়ে গণভোট আমাদের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সংস্কার প্রয়োজন, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা এসব প্রশ্নে রাষ্ট্রের পুনর্বিবেচনা জরুরি। কিন্তু সংস্কারের পথ যদি হয় জনগণকে না বুঝিয়ে, বিতর্কের সুযোগ সীমিত রেখে, মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করে এবং পরিসংখ্যানের জোরে বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট ডেকে আনে।
গণতন্ত্রে জনগণ সংসদে প্রতিনিধি পাঠান এই বিশ্বাসে যে, তার প্রতিনিধি তার হয়ে জটিল আইনগত সিদ্ধান্ত নেবেন। সব প্রশ্নে সরাসরি গণভোটের পথ বেছে নেওয়া তখনই যৌক্তিক, যখন বিষয়টি স্পষ্ট, বোধগম্য এবং বিকল্পগুলো পৃথকভাবে উপস্থাপিত। একগুচ্ছ জটিল সাংবিধানিক প্রস্তাবকে একত্রে বেঁধে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’তে সীমাবদ্ধ করা গণতান্ত্রিক সরলীকরণ, যা বাস্তবে জটিলতাই বাড়ায়।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নতুন সরকারের সামনে এখন দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে গণভোটের ফলকে সম্মান, অন্যদিকে তার প্রক্রিয়াগত ও নৈতিক প্রশ্নগুলোর স্বীকারোক্তি। প্রয়োজন সর্বদলীয় সংলাপ, উন্মুক্ত সংসদীয় বিতর্ক, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ। সংস্কার হোক রাষ্ট্রের স্বার্থে। কোনো গোষ্ঠী, কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত বা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার স্বার্থে নয়।
ভোট সফল হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র তখনই সফল হয়, যখন মানুষ বুঝে, অংশ নেয় এবং বিশ্বাস করে যে তার মতামত সত্যিই মূল্যবান। এই গণভোট আমাদের শিখিয়েছে সংখ্যা দিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। গণতন্ত্রের আসল শক্তি অঙ্কে নয়, আস্থায়। সেই আস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব এখন নির্বাচিত রাজনীতিকদেরই।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
কেকে/ এমএস