আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে গত কয়েক বছরে যে আমূল পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি। বিশ শতকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ছিল এক প্রকারের অভিভাবকসুলভ, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে আমরা এক নতুন দর্শনের উত্থান দেখছি, যা গবেষকদের ভাষায় ‘ডনরো ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
মূলত ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিনের একটি আধুনিক ও ট্রাম্পীয় সংস্করণ হলো এই ‘ডনরো ডকট্রিন’। প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো যখন প্রায় দু’শ বছর আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না, তখন সেটি ছিল আমেরিকান মহাদেশকে রক্ষা করার একটি প্রতিরক্ষা কবচ। বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই একই নীতিকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে নতুন রূপে সাজিয়েছেন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ইউরোপীয় শক্তি নয়, বরং উদীয়মান পরাশক্তি চীন। এই ডনরো ডকট্রিন কেবল আমেরিকান মহাদেশ বা পশ্চিম গোলার্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি অলিগলিতে অনুভূত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে একদিকে ওয়াশিংটনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আর অন্যদিকে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৮২৩ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো কংগ্রেসের বার্ষিক ভাষণে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন, তার সারমর্ম ছিল আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য। তৎকালীন সময়ে লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় শক্তির পুনরুত্থান রোধ করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। দীর্ঘকাল ধরে এই নীতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। বিশ শতকের স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে এই মনরো ডকট্রিনকে ব্যবহার করেই যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্রের বিস্তার রোধ করেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এবং বিশ্বায়নের যুগে মনরো ডকট্রিন কিছুটা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ২০১৭ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন, তখনই তিনি এই পুরোনো ধারণাটিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার আভাস দিয়েছিলেন। জন বোল্টনের মতো কট্টরপন্থিরা তখন বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন যে মনরো ডকট্রিন আজও জীবিত এবং সক্রিয়। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে আমরা যা দেখছি তা পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রণীত ২০২৫ সালের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি বা এনএসএস দলিলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য পুনপ্রতিষ্ঠা করা এবং বাইরের যে কোনো শক্তির প্রবেশ রোধ করাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার। এই বাইরের শক্তি বলতে এখন মূলত চীনকেই বোঝানো হচ্ছে।
মনরো ডকট্রিনের মূল কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তখনই বিশ্বের অন্য প্রান্তে হস্তক্ষেপ করবে যখন তার নিজের নিরাপত্তা এবং স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকবে। এই নীতি একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং আধিপত্যবাদী। এটি একদিকে বলছে আমেরিকা বিশ্ব পুলিশের ভূমিকা পালন করবে না, আবার অন্যদিকে বলছে নিজের প্রভাব বলয়ে অন্য কাউকেও বরদাস্ত করবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ডনরো ডকট্রিনের প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলটি এখন সরাসরি দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া চিরকালই ভারতের প্রভাব বলয় হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু গত এক দশকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই এই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন যখন দক্ষিণ এশিয়ায় এসে পৌঁছায়, তখন তা প্রধানত দুটি ধারায় কাজ করে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোকে চীন থেকে দূরে সরানোর জন্য সরাসরি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতিতে ভারতের জন্য এক বিশেষ অবস্থান রাখা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ট্রাম্পের নীতিতে আমরা এক ধরনের ‘ট্রানজ্যাকশনাল’ বা লেনদেনমূলক মনোভাব দেখছি। অর্থাৎ, কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী সুবিধা পাবে তা নির্ভর করছে সেই দেশ চীনের সঙ্গে কতটা দূরত্ব বজায় রাখছে তার ওপর।
ভারতের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের রসায়ন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত রসায়ন এবং চীনের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থান ভারতকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এক অপরিহার্য অংশীদার করে তুলেছে। তবে এই অংশীদারিত্ব সবসময় নিরবচ্ছিন্ন নয়। ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিতে ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক নীতি ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এই অঞ্চলের মোড়ল হিসেবে মেনে নিতে রাজি। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো এক ধরনের চাপে পড়ছে। তাদের সামনে এখন কেবল দুটি পথ- হয় ভারতের ছত্রচ্ছায়ায় মার্কিন বলয়ে থাকা, নতুবা চীনের অর্থনৈতিক প্রকল্পের অংশ হওয়া। তবে ট্রাম্পের নীতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমরা দেখেছি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির যখন ওয়াশিংটন সফর করেন, তখন ট্রাম্প তাকে অভাবনীয় সম্মান দেন। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন। পাকিস্তান নিজেকে ‘ক্রিপ্টো কারেন্সি’ ও ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ বা খনিজ সম্পদের উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করে ট্রাম্পের সুনজরে আসার চেষ্টা করছে। এটি ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও ট্রাম্পের ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ বা অনিশ্চিত আচরণের একটি বড় উদাহরণ।
ডনরো ডকট্রিনের আর একটি ভয়াবহ প্রভাব হলো অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদ। ট্রাম্পের ২ এপ্রিল ২০২৫-এর সেই ঘোষণা যেখানে তিনি প্রায় সব আমদানিকৃত পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার পোশাক শিল্প ও উৎপাদন খাতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ডনরো ডকট্রিন একটি বড় ধাক্কা। ট্রাম্প বলছেন তিনি আমেরিকায় কলকারখানা ফিরিয়ে নেবেন। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। এছাড়া ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আমরা দেখছি যে যুক্তরাষ্ট্র তার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে লাতিন আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়ায়ও প্রভাব বিস্তার করছে। এই সম্পদ দখলের লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ট্রাম্পের নীতিতে গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের চেয়ে বড় হলো ব্যবসায়িক স্বার্থ। যদি কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করে আমেরিকার লাভ হয়, তবে সেই দেশ একনায়কতান্ত্রিক হলেও ট্রাম্পের কোনো আপত্তি নেই। এই বাস্তববাদী বা রিয়েলপলিটিক দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দোদুল্যমান করে তুলেছে।
২০২৬ সালের পরবর্তী কয়েক বছরে এই অঞ্চলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর যে চেষ্টা ওয়াশিংটন করছে, তার বিপরীতে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে গভীর শঙ্কা রয়েছে। তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। যদি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আঞ্চলিক জোটগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে এবং একটি অভিন্ন ব্লকের মাধ্যমে পরাশক্তিদের সাথে দরকষাকষি করতে পারে, তবেই তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু ট্রাম্পের নীতিই হলো জোটগুলোকে দুর্বল করা। তিনি বহুপাক্ষিক সম্পর্কের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বেশি বিশ্বাসী। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনৈক্য বাড়তে পারে। ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন আসলে বিশ্বব্যবস্থাকে এক বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে শক্তির জয়গানই শেষ কথা।
ট্রাম্পের নীতিতে বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা দুটই ক্ষণস্থায়ী, একমাত্র স্থায়ী হলো মার্কিন স্বার্থ। এই কঠোর সত্যকে ধারণ করেই দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রনায়কদের আগামী দিনের পথ চলতে হবে। ইতিহাস আমাদের শেখায় যে পরাশক্তিদের লড়াইয়ে ক্ষুদ্র শক্তিগুলো তখনই টিকে থাকে যখন তারা নিজেদের ভূ-খণ্ডকে অন্যের যুদ্ধক্ষেত্র হতে দেয় না। ট্রাম্পের ডনরো ডকট্রিন হয়ত সাময়িকভাবে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করবে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। আমরা কি পারব এই ঝড়ের মধ্যে নিজেদের নৌকার হাল শক্ত করে ধরে রাখতে? উত্তরটি হয়ত মহাকালের গর্ভেই লুকিয়ে আছে, তবে বর্তমান আমাদের সতর্ক করছে এক মহাপ্রলয়ের।
লেখক : কলামিস্ট