খেলনা হাতে দৌড়ানোর বয়স। কাঁধে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে সকালে বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে ক্লাসে যাওয়ার কথা। অথচ ৯ বছরের শফিকুল ইসলাম এখন বিছানায় শুয়ে শ্বাস নিতেই লড়াই করছে। বুক ধড়ফড় করলে সে চুপ হয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে বলে, “আমি কি আবার দৌড়াতে পারবো?”
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বাইনতলা ইউনিয়নের এই শিশুর হৃদপিণ্ডে বাসা বেঁধেছে জটিল রোগ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার হার্টের ভালভ নষ্ট হয়ে গেছে। খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষার পর এবং পরে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হলে একই কথা জানানো হয়—অপারেশন ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ নেই।
চার লাখ টাকার সেই অপারেশন এখন শফিকুলের পরিবারের কাছে স্বপ্নের মতোই দূর। ভাঙা ঘর, অসুস্থ বাবা, গৃহিণী মা—সবকিছুর মাঝখানে ছোট্ট ছেলেটি শুধু একটি সুযোগ চায়। আবার স্কুলে যেতে, আবার মাঠে নামতে, আবার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার হার্টের একটি ভালভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমে খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা ভালভ পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। পরে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও একই সিদ্ধান্ত জানানো হয়—অপারেশন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু সেই অপারেশনের খরচ প্রায় চার লাখ টাকা। আর এই টাকাটাই যেন পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে দরিদ্র পরিবারের সামনে।
শফিকুলের বাবা শেখ আব্দুল রশিদ নিজেও অসুস্থ। তার মেরুদণ্ডের হাড়ে গুরুতর সমস্যা। ভারী কাজ তো দূরের কথা, নিয়মিত হালকা কাজও করতে পারেন না। দুই-একদিন কোনোভাবে কাজ করলে অসহ্য ব্যথায় আবার বিছানায় পড়ে যেতে হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ছেলেটা ছোট থেকেই একটু দুর্বল ছিল। ভাবছিলাম বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন ডাক্তার বলছে অপারেশন করতে হবে। আমি বাবার জায়গা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু নিজের শরীরই তো ভালো না। ঠিকমতো কামাই করতে পারি না। চার লাখ টাকা কোথায় পাবো?”
তিনি আরও বলেন, “একটা গাভি গরু ছিল। ওটাই ছিল আমাদের শেষ সম্বল। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে সেটাও বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ঘরে আর কিছুই নেই। মনে হয় হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে—ছেলেকে বাঁচাতে পারছি না।” সন্তানকে হারানোর আশঙ্কা এখন প্রতিদিন তাকে তাড়া করে ফিরছে।
মা আসমা বেগম কোলে এক বছরের ছোট মেয়ে ইসরাত জাহানকে নিয়ে দিশেহারা। একদিকে অসুস্থ ছেলে, অন্যদিকে দুধের শিশু—দুই সন্তানের দায়িত্ব তার কাঁধে।
তিনি বলেন, “বিয়ের দুই বছর পর আল্লাহ আমাদের কোলজুড়ে শফিকুলকে দিয়েছিল। ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া এই ছেলেকে ঘিরেই ছিল আমাদের সব স্বপ্ন। ভাবছিলাম পড়াশোনা শিখে মানুষ হবে। কিন্তু এখন ডাক্তার বলছে অপারেশন করতে হবে, তা না হলে দিন দিন সমস্যা বাড়বে। এই কথা শোনার পর মনে হলো মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে।’’
‘‘ছেলের চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আনবো? গরুটাও বিক্রি করে দিলাম। এখন সবার কাছে হাতজোড় করে বলি—আমার ছেলেটাকে বাঁচান। ও আবার স্কুলে যেতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায়। মাঝে মাঝে শফিকুল বলে, ‘মা, আমি কি আর দৌড়াতে পারবো না?’ তখন আমি কী বলবো? বুকের ভেতরটা ফেটে যায়।”
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র শফিকুল দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। সহপাঠীরা স্কুলে যায়, মাঠে খেলে, আর সে বিছানায় শুয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘শ্বাসকষ্ট হলে হঠাৎই কাঁপতে থাকে তার শরীর। দুর্বলতায় ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না। তবু স্বপ্ন দেখে—আবার স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাসে যাবে, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করবে। সে বলে, “আমি আবার স্কুলে যাব, বড় হয়ে ডাক্তার হব।”
পাশের বাড়ির গৃহবধূ রিসমা বেগম বলেন, “রশিদের নিজের শরীরই ভালো না। দুই বেলা ঠিকমতো খাওয়াই কষ্ট। গরুটাও বিক্রি করে দিয়েছে। এই অবস্থায় চার লাখ টাকা জোগাড় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।”
আরেক প্রতিবেশী রসুল শেখ বলেন, “আমরা সবাই মিলে কিছু সাহায্য করেছি, কিন্তু এত বড় টাকার জন্য এটা যথেষ্ট না। ছেলেটা খুব শান্ত। তাকে কষ্টে দেখলে মন ভেঙে যায়।”
স্থানীয় বৃদ্ধা শেখ সত্তার বলেন, “ছেলেটা ছোটবেলা থেকে সুস্থ ছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন অবস্থা হবে ভাবিনি। আল্লাহর দোহাই লাগে, যারা সামর্থ্যবান আছেন তারা যদি একটু করে এগিয়ে আসেন, তাহলে হয়তো ছেলেটা বাঁচবে।”
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমদ্দার বলেন, “আমি রিপোর্ট দেখেছি। এখন দ্রুত অপারেশন না করলে ঝুঁকি আরও বাড়বে। হার্টের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় প্রতিদিনই জটিলতা বাড়ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, শারীরিক অবস্থাও ততই নাজুক হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে।”
কেকে/এলএ