এত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ শুরু করে দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সপ্তাহ পেরোলেও এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি দলটি। তারেক রহমানসহ দলের নীতিনির্ধারকরা ব্যস্ত সময় পার সরকারি নানা কাজে। দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী জঞ্জাল পরিষ্কারে সময় দিতে হচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের।
এতে সারা দেশে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা শিথিলতা দেখা দিয়েছে। কমেছে নজরদারি। আর এই সুযোগে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে বিএনপির তৃণমূলে। বিশেষ করে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা নানা স্বার্থগত কারণে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) মাগুরায় ভিজিএফ চালের কার্ড ভাগাভাগি নিয়ে সঘর্ষে জড়িয়েছে বিএনপির দু’গ্রুপ। এ সময় দলীয় অফিসও ভাঙচুর করা হয়। একই দিন চাঁদপুরের মতলবে টেন্ডার নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান বিএনিপর দুই পক্ষ। এ ছাড়া চাঁদাবাজি ও দখলাবাজিতে না উঠে আসছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি সদ্যই সরকার গঠন করেছে। এ সময় দলটির নেতাকর্মীদের, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা মেনে চলা উচিৎ। তা না হলে শুরুতেই নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। যা সরকারের পথচলাকে কঠিন করে তুলবে।
তারা আরো বলছেন, নতুন সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশ সমান। সেই প্রত্যাশা এই সরকারকে পূরণ করতে হবে। আর এর জন্য শুধু শীর্ষ নেতৃত্বই নয়, সারা দেশের তৃণমূলকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
গত বুধবার রাতে মাগুরায় ঈদের ভিজিএফ চালের কার্ড ভাগাভাগি নিয়ে পৌর এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির দু’গ্রুপে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় স্থানীয় বিএনপি অফিস ভাঙচুরের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি শেখ তরিকুল ইসলাম সহ অন্তত ১১ গুরুতর আহত হয়েছেন।
দলের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঈদ উপলক্ষে মাগুরা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য পৌর বিএনপির পক্ষ থেকে ৩০০ জনের জন্যে ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ করা হয়।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে পৌরসভা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক উজ্জ্বল হোসাইন ওই কার্ড বরাদ্দের জন্যে ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে যান। এ সময় বরাদ্দকৃত কার্ডের মধ্যে থেকে একটি অংশ দাবি করেন আবুল হোসেন আবু নামে একজন বিএনপি কর্মী। কিন্তু ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শেখ তরিকুল ইসলাম তাকে সেটি দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ বিষয়টি নিয়ে রাত ৮টার উভয় পক্ষ বাটিকাডাঙ্গা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে আবুল হোসেন আবু সমর্থিতরা ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি শেখ তরিকুল ইসলামকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এছাড়া প্রতিপক্ষের হামলায় আসলাম, বাকের, দেলোয়ার, ইয়াছিন, রহিল সহ আরো ১০ জন কমবেশি আহত হন। খবর পেয়ে সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এদিকে চাঁদপুরের মতলব উত্তরের ছেঙ্গারচর পৌরসভায় হাট-বাজার ইজারার টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে ছেঙ্গারচর পৌরসভায় গরুর বাজার, মাছ বাজার ও পাঁচটি সিএনজি স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন হাট-বাজার ইজারার সিডিউল জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, সিডিউল জমা দিতে গেলে বিএনপির যুবদল নেতা আবু সাঈদ বেপারী ও পৌর যুবদলের আহ্বায়ক উজ্জ্বল ফরাজী পক্ষ পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি নান্নু প্রধানসহ অন্যদের বাধা দেন। সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা বদরুজ্জামান (৫৫), সায়েম (২০) ও সফিউল্লাহসহ (৩৫) আরও দুজন।
যুবদল নেতা আবু সাঈদ বেপারী বলেন, ‘সিডিউল জমা দেওয়ার সময় ছিল দুপুর ১টা পর্যন্ত। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কয়েকজন সিডিউল নিয়ে এলে আমরা বাধা দিই। এ সময় তারা আমাদের কর্মী সফিউল্লাহকে মারধর করে।’
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নুরুল হক সরকার ও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি নান্নু প্রধান দাবি করেন, প্রশাসনের কারসাজির মাধ্যমে একপক্ষের সিডিউল গ্রহণ করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, টেন্ডার বাক্স উপজেলা, থানা ও পৌরসভায় রাখার কথা থাকলেও কেবল পৌরসভায় রাখা হয়।
তারা আরও অভিযোগ করেন, সিডিউল জমা দিতে গেলে যুবদল নেতা আবু সাঈদ ও উজ্জ্বল ফরাজীর সমর্থকেরা বাধা দেন এবং বিএনপি নেতা বদরুজ্জামানের মাথায় রক্তাক্ত জখমসহ কয়েকজনকে আহত করেন। তারা ছেঙ্গারচর পৌরসভার হাট-বাজার ইজারা বাতিল করে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি জানান।
মতলব উত্তর থানার তদন্ত কর্মকর্তা প্রদীপ মণ্ডল বলেন, “সিডিউল জমা দেওয়া নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে পাবনার চাটমোহরে হাটের টেন্ডার শিডিউল দাখিল করা নিয়ে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হাবিবুর রহমানের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করেছে বিএনপি নেতাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পৌনে একটার দিকে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে পুলিশের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ উপস্থিত থাকলেও বাঁশি বাজানো ছাড়া হামলাকারীদের প্রতিহত করতে দেখা যায়নি।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ছিল উপজেলা পরিষদের ডাকা হাট-বাজার ইজারার টেন্ডার শিডিউল দাখিলের শেষ দিন। একই সঙ্গে বিকেল তিনটায় দাখিলকৃত টেন্ডার বাক্স খোলার সময় নির্ধারিত ছিল। দুপুরে ছাইকোলা ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আওরঙ্গজেব তার নিজ এলাকার একটি হাটের টেন্ডার শিডিউল দাখিল করতে উপজেলায় যান। তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে রাখা বাক্সে তার টেন্ডার শিডিউলটি ফেলেন।
এ সময় আশপাশে থাকা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গিয়ে তার ওপর হামলা করে। সেখানে থাকা আনসার সদস্য ও পুলিশ প্রথমে তাদের নিবৃত করে নিচে নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।
এর কিছু সময় পর ইউএনও অফিস থেকে নিজের ব্যক্তিগত কাজ শেষে বের হচ্ছিলেন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হাবিবুর রহমান। তখন ‘জামায়াতের সেক্রেটারি এখানে কেন’ বলেই তার ওপর হামলা করে বেধড়ক মারধর শুরু করেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
কেকে/এলএ