ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রতিবন্ধী শিশু সাইদা আক্তারের (৮) মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যাচ্ছে তা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে চিহ্নিত মহল। পরিস্থিতি এলাকা ‘লিজ’ নেওয়ার মতো। চেচুয়ার সব কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে। দেখার যেন কেউ নেই। মহলটি দেড় বছর ধরে চন্ডিমন্ডপের ‘প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’ গ্রাস করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালীরা পুলিশ ‘ম্যানেজ’ করে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা মো. নুর ইসলামকে মুক্তাগাছা থানার ২টি রাজনৈতিক মামলাসহ ৩টি মামলায় ২ মাস ৭ দিন জেল খাটায়। নাস্তানাবুদ বানিয়ে পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই শিক্ষক পরিবারকে। হুমকি দেওয়া হয় এলাকা ছাড়া করার। রোববার (২১ জুন) সকালে আলোচিত বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান মাসুদকে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের ভ্যান চালক মানিক মিয়াকেও আটকে রাখা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে প্রভাবশালী মহল পুলিশ ও সন্ত্রাসী নিয়ে প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে যায়। আতঙ্কিত হয়ে প্রতিবন্ধী শিশুরা ছুটোছুটি শুরু করে। এ সময় ৪-৫ জন কম-বেশি আহত হয়। ‘সেরিব্রাল পালসি’ রোগে আক্রান্ত প্রতিবন্ধী সাইদা আক্তার (৮) দেওয়ালের সঙ্গে মাথায় আঘাত পায়। খিচুনি দিয়ে রক্ত বমি করে| পরিস্থিতি বেগতিক হলে পুলিশ ও প্রভাবশালীরা বিদ্যালয় ছাড়ে। এতে চরমভাবে লঙ্ঘিত হয় প্রতিবন্ধী শিশু সুরক্ষা আইন-২০১৩। ২ শিক্ষক তাৎক্ষণিক সাইদাকে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সাইদা ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকা নেওয়া হয়েছিল। প্রভাবশালীদের চাপে বৃহস্পতিবার ভোরে প্রতিবন্ধী সাইদাকে বাড়িতে নেওয়া হয়। শুক্রবার দুপুর ২টায় শিশুটি মারা যায়।
জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে প্রতিবন্ধী সাইদা মারা যাওয়ার পর প্রভাবশালীরা দীর্ঘ দেনদরবার করে। ময়নাতদন্ত ছাড়াই সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় লাশ দাফন করা হয়। পরিবারকে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে লাশ দাফনে বাধ্য করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী সাইদার মৃত্যুর ঘটনায় নিজের দায়িত্ববোধ থেকে প্রধান শিক্ষক মো. নুর ইসলাম মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ প্রেরণ করেন। তিনি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মৃত্যুর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। সাইদার মৃত্যু নিয়ে শনিবার ˆদনিক খোলা কাগজের শেষ পৃষ্ঠায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে ঘটনা ধামাচাপা ও ধুম্রজাল সৃষ্টি করার জন্য ভাড়াটে লোক দিয়ে রোববার সকালে চেচুয়া বাজারে প্রশ্নবিদ্ধ মানববন্ধন করা হয়েছে। এতে ওই প্রভাবশালী উপস্থিত থেকে অন্যদের শিখিয়ে দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ান। ভিডিও ফুটেজে এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে সেখানে উপস্থিত হন মুক্তাগাছার সহকারী কমিশনার (ভূমি) লুবনা আহমেদ লুনা। তিনি বিরোধপূর্ণ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তারসহ ৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে হওয়া জাল-জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করে সেখান দিয়ে ফিরছিলেন।
সূত্র জানায়, ‘প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’ নিয়ে দেড় বছর ধরে চরম দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এক পক্ষের হয়ে প্রভাবশালী মহল প্রতিষ্ঠানটি গ্রাস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা মো. নুর ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে মিথ্যা মামলা। গত ৪ জুন এ মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১০ দিন পর তিনি জামিনে ছাড়া পান। জামিন শুনানির দিন মুক্তাগাছা থানার একটি রাজনৈতিক মামলায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানালে বিজ্ঞ বিচারক রাগান্বিত হয়ে নামঞ্জুর করেন। এর আগে নুর ইসলামকে বিদ্যালয় ও এলাকা ছাড়া করতে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ মুক্তাগাছা থানার রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করানো হয়।
জানা যায়, প্রথম মামলায় জামিন হওয়ার আগের দিন আরেকটি মামলায় নুর ইসলামকে শোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। ১ মাস ২৭ দিন পর তিনি কারামুক্ত হন| মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনজীবীর শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে কম সময়ের মধ্যে আদালত তাকে জামিন দেন। এ ধরনের রাজনৈতিক মামলায় সাধারণত ৬ মাসের আগে জামিন হওয়ার নজির খুব কম। এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে প্রধান শিক্ষক মো. নুর ইসলাম পুনরায় বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ওই দিনই চেচুয়া বাজার থেকে রাজনৈতিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়া হয়। আড়াই লাখ টাকায় মুক্তাগাছা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কাণ্ড ঘটান বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। নুরকে এখনো মুক্তাগাছা থানার অন্য ২টি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সূত্র মতে, মহা ষড়যন্ত্রের শিকার শিক্ষক নুর ইসলাম বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার আমলে ২০০২ সালে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন।
সূত্র জানায়, সুখ নগরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ২০১২ সালে মুক্তাগাছার চেচুয়া চন্ডিমন্ডপে ‘প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করে। প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর পর বিধি অনুযায়ী ২০১৬ সালে মো. নুর ইসলাম প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। নানা চড়াই উৎরাইয়ের পর ২০২১ সালে বিদ্যালয় এমপিভুক্ত হয়। এক যুগেরও বেশি সময় ভালোই চলছিল বিদ্যালয়টি। প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে ২০২৫ সালের শুরুতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন শিক্ষক। তাদের সহযোগিতা করছেন প্রশাসনের কয়েক কর্মকর্তা। অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ দায়িত্বে থাকা ৪ জনের বিরুদ্ধে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন বিদ্যালয়ের ৩ সিনিয়র শিক্ষক, জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অভিযোগে বলা হয়, অবৈধভাবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মর্জিনা আক্তার, লিয়াকত আলী, শফিকুল ইসলাম ও উম্মে হাবিবার নিয়োগ অবৈধ। তারা জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। তাদের বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। রোববার এ অভিযোগের সর্বশেষ তদন্তে যান এ্যাসিল্যান্ড লুবনা আহমেদ লুনা।
রোববার এ বিদ্যালয় নিয়ে কথা হয় ওই এলাকার অর্ধশত মানুষের সঙ্গে। তারা জানান, চিহ্নিত মহল বিদ্যালয়টি গ্রাস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা নুর ইসলামকে সাজানো ও মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে। বিদ্যালয়ে ২ শতাধিক প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষার্থী ও ৩৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে। তারা জানান, নুর ইসলাম অন্যদের নিয়ে তিলতিল করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। তাকেই তাড়াতে চাচ্ছে চিহ্নিত মহল। সূত্র মতে, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এক প্রভাবশালী অন্যদের নিয়ে চেচুয়া এলাকা বিষিয়ে তুলেছে। মর্জিনা আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহাল রাখতে এরা মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মর্জিনার স্বামী এমরান মাসুদ কবীর।
কেকে/এলএ