চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অস্ত্রের মহড়া। আবাসন খাত, ঝুট ব্যবসা, শিল্প-কারখানা, বালুমহাল, নির্মাণকাজ, সরকারি টেন্ডার থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—কোনো খাতই যেন চাঁদাবাজদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলি, প্রাণনাশের হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শন এবং চাঁদা না পেয়ে হামলার ঘটনায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বড় ধরনের অগ্রগতি না থাকায় এবং আলোচিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ধীরগতির কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া, ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পর্যন্ত হুমকি দেওয়ার ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। সর্বশেষ গত শনিবার দুপুরে নগরের চান্দগাঁও থানার বিসিক শিল্প এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ‘বোরহান বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপের সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনার পর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর পদপ্রার্থী এবং এক যুবদল নেতাকে মুঠোফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গোলাপি টি-শার্ট পরিহিত এক যুবক একটি পোশাক কারখানার সামনে থেকে সড়কের দিকে এগিয়ে এসে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে একটি পিস্তল বের করেন। পরে তিনি কারখানার দিকে তাক করে গুলি ছোড়েন এবং সড়কে হেঁটে যেতে যেতে আরও গুলি করেন। এ সময় আশপাশে পথচারী ও শ্রমিকদের চলাচল করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিল্পাঞ্চলজুড়ে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলির শব্দে আশপাশের বিভিন্ন কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে গেট বন্ধ করে দেয়। শিল্প এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে।
চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিসিক এলাকায় গুলির ঘটনার তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনা ঘটতে পারে। তদন্তে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।’
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ধরন আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। গত ১৪ জুন নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভির ইসলামের কার্যালয়ে ঢুকে অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি টেবিলের ওপর অস্ত্র রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে ‘বড় সাজ্জাদ’ পরিচয়ে একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভির ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি আমি প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। তবে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি।’
সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বড় ব্যবসায়ীরাও সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে চলতি বছরে দুই দফা গুলি চালানোর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে তা না পেয়ে এ হামলা চালানো হয়।
জানা গেছে, গত ২ জানুয়ারি প্রথমবার তার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে চার অস্ত্রধারী আবারও বাড়ির সামনে এসে ১২ থেকে ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশি অনুসন্ধানেও এ ঘটনায় সাজ্জাদ বাহিনীর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের বাইরে উপজেলাগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত ১৪ মে ভোরে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের দিঘিরপাড় এলাকায় পুলিশের তথ্যদাতা (সোর্স) আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়ির সামনে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্রধারীরা বাড়ির সামনে এসে গুলি ছোড়ে।
আবছার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এক মাস ধরে সন্ত্রাসীরা আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছিল। টাকা না দেওয়ায় তারা অস্ত্র নিয়ে বাড়ির সামনে আসে। স্থানীয়রা চিৎকার শুরু করলে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যায়। পরে বাড়ির পাশের একটি দোকান লক্ষ্য করেও গুলি করে।’
এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর নগরের বালুছড়া উত্তর কুলগাঁও এলাকায় চাঁদা দাবির প্রতিবাদ করায় যুবদল নেতা আহমেদ রেজা বাবুর বাড়ি লক্ষ্য করে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সহযোগীরাই এ হামলা চালায়। ওই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নুরুল হুদা নামে বায়েজিদ এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে শিল্প-কারখানা, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, নির্মাণ খাত ও আবাসন ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও ভয় পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ বলেন, ‘চাঁদাদাবিসহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
কেকে/এলএ