নরসিংদীর মহিষাশুড়ায় পনেরো বছরের এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামনে সেই পুরোনো, ভয়ংকর চক্রটিকেই আবার হাজির করেছে—ধর্ষণ, স্থানীয়ভাবে ‘মীমাংসা’, বিচার চাওয়ায় হুমকি, তারপর আরও বড় অপরাধ। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার একই দৃশ্যপট ফিরে আসে?
গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন জেলায় আলোচিত বহু ঘটনার দিকে তাকালেই একটি মিল পাওয়া যায়। ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, ভুক্তভোগী পরিবার থানায় যেতে চেয়েছে; কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীরা ‘সমঝোতা’ করে দিতে চেয়েছেন। কোথাও টাকা, কোথাও বিয়ে, কোথাও এলাকা ছাড়ার চাপ। অথচ আইন স্পষ্টভাবে বলে, ধর্ষণ একটি অমীমাংসিত ফৌজদারি অপরাধ। কোনো সালিশে এর নিষ্পত্তি বৈধ নয়।
জাতীয় গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, ধর্ষণের পর বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী নিরাপত্তার অভাব, সামাজিক লজ্জা এবং প্রভাবশালীদের চাপ—এসব মিলিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রায়শই একা হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও চার্জশিটে বিলম্ব, সাক্ষ্যগ্রহণে দেরি বা আপসের চাপের কারণে বিচার প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। ফলাফল হিসেবে অপরাধীরা বার্তা পায়—পার পাওয়া সম্ভব।
নরসিংদীর ঘটনাতেও অভিযোগ উঠেছে, প্রথমে ধর্ষণ, পরে স্থানীয় ‘মীমাংসা’। যদি তা সত্যি হয়ে থাকে, তবে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত। কারণ অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে অপরাধের যথাযথ বিচার হয় না, সেখানে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বিচার চাওয়াকে ‘দুঃসাহস’ হিসেবে দেখা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারকে চুপ করাতে চাপ, হুমকি, এমনকি সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মানসিকতা। এখনো অনেক এলাকায় ধর্ষণের শিকার মেয়েকেই দায়ী করা হয়। তার চলাফেরা, পোশাক, সময়—সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়; কিন্তু অভিযুক্তের চরিত্র বা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে অনীহা থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধীদের পরোক্ষভাবে শক্তি জোগায়।
আইনি কাঠামোর দিক থেকে দেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ধর্ষণের শাস্তি বাড়ানো হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়েছে। কিন্তু কাগজে কঠোর আইন আর বাস্তবে দ্রুত বিচার এক জিনিস নয়। পরিসংখ্যান বলছে, অভিযোগের তুলনায় দণ্ডের হার এখনো সন্তোষজনক নয়। তদন্তের মান, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষী সুরক্ষা—এসব জায়গায় ঘাটতি রয়ে গেছে।
নরসিংদীর কিশোরীর ঘটনায় পুলিশ বলছে, লিখিত অভিযোগ পায়নি। কিন্তু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় রাষ্ট্র নিজেই বাদী হয়ে তদন্তে নামতে পারে। বিশেষ করে যখন অভিযুক্তরা গা ঢাকা দিয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ, তখন স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ জরুরি।
এ মুহূর্তে তিনটি স্তরে পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিটি ধর্ষণ অভিযোগে তাৎক্ষণিক মামলা ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সালিশ বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ বন্ধ করতে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার চাওয়াই যদি জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে।
তৃতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়াকে সময়বদ্ধ ও স্বচ্ছ করতে হবে। আলোচিত মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করলে জনআস্থা বাড়বে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হলে বার্তা একটাই হতে হবে—ধর্ষণের কোনো আপস নেই, কোনো সালিশ নেই, কোনো ছাড় নেই। আইনই শেষ কথা। আর সেই আইনকে কার্যকর করতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমানভাবে।
কেকে/এলএ