ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের কিছু স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে রাজধানীতে বেড়েছে ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ অপরাধপ্রবণতা। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল না। তবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। রাজধানীসহ দেশের অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশের অভিযান জোরদার হয়েছে। এতে স্বল্প সময়েই জনমনে ফিরেছে স্বস্তি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারি ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের কিছু অঞ্চল রীতিমতো ‘ক্রাইম জোনে’ পরিণত হয়েছিল। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকা অন্যতম। এ ছাড়া উত্তরা, যাত্রাবাড়ি ও গাজীপুরের টঙ্গীতে অপরাধীরা প্রভাব বিস্তার করেছিল। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। কঠোরভাবে অপরাধীদের দমন করতে হবে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় মোহাম্মদপুর থানার কৃষি মার্কেট, জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোহাম্মদপুর থানার ডিউটি অফিসার ফেরদৌস। অন্যদিকে আদাবর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানিয়েছেন থানাটির ডিউটি অফিসার মোহাম্মদ সোহেল।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ গত তিন দিনে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চিহ্নিত চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনরা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অভিযানে মাদকদ্রব্য ও কিছু দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সম্প্রতি এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তবে পুলিশের টানা অভিযানের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী সুজন বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগেও সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখতে ভয় লাগত। এখন পুলিশি টহল বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।’
আদাবরের বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।’
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি সন্ধ্যার পর রাস্তায় টহল বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকার ব্যবসায়ী চান মিয়া বলেন, ‘আগে প্রায়ই চাঁদাবাজদের উৎপাত ছিল। এখন পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে, ফলে ব্যবসা পরিচালনায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতে বাইরে বের হতে আগে ভয় লাগত। এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো মনে হচ্ছে। অভিযান যেন নিয়মিত থাকে, সেটাই চান তারা।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। জনগণের সহযোগিতায় মোহাম্মদপুরকে অপরাধমুক্ত রাখতে আমরা কাজ করছি।’
পুলিশ জানিয়েছে, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য জানাতে স্থানীয়দের পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে রিয়াজ নামে এক যুবককে হাতেনাতে চাপাতিসহ আটক করেছে জনতা। রিয়াজ জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় একটি চাপাতি নিয়ে নামাজে বের হয়েছিল। পথে বাগড়া দেয় জনতা। তাদের সন্দেহ হলে তারা তাকে তল্লাশি করে একটি চাপাতি পায়। পরে তারা পুলিশে খবর দেন।
গত কয়েক দিন আগে বসিলায় এক দোকানিকে অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদা চান এক যুবক। পরে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে এলাকার এক চিহ্নিত চাঁদাবাজকে আটকের পর এলাকায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায় পুলিশ। এতে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে, বিশেষ করে চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান ও বসিলা গরুর হাট এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে।
মোহাম্মদপুর জোনের এডিসি জুয়েল রানা বলেন, ‘আমরা গত রাতেও অভিযান চালিয়েছি। অভিযানের সময় জেনেভা ক্যাম্প ও কৃষি মার্কেট এলাকা থেকে কিছু মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী ছাড়াও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে সাঁড়াশি অভিযানের পর লোকজনের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে।’
জানা গেছে, শুক্রবার রাতে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইফতারের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২০০-র বেশি সদস্য জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালায়। অভিযান চলে গভীর রাত পর্যন্ত। অভিযানে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ, ডিএমপির সোয়াট টিম এবং প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড অংশ নেয়। পরে সেখানে হাজির হন আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার।
ডিএমপি জানিয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে চিরুনি অভিযান শুরু করা হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিভিন্ন অভিযোগে আটক করা হয়। এ সময় বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করা হয়।
জেনেভা ক্যাম্পে অভিযানের পর মধ্যরাতে সেখানে নতুন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক, তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে—কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
এ সময় ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার ও তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কেকে/এলএ