কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’। সময়ের অমোঘ নিয়মে পুরাতনকে সরিয়ে জায়গা করে নেয় নতুন কিছু। আর সেই পরিবর্তনের ভিড়ে কিছু স্থান হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে, থেকে যায় কেবল ইতিহাসের পাতায়। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের দুটি ফেরিঘাট এবং তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুটি ব্যস্ততম বাজারের গল্পও ঠিক তেমনই। দেশের ‘লাইফ লাইন’ খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণের আগে এই ফেরিঘাট দুটিই ছিল কয়েক জেলার লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, শের শাহের আমলের মধ্যযুগে নির্মিত ‘সড়ক-ই-আজম’ বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড শেষ হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে। অন্যদিকে ইংরেজ আমলে নির্মিত ‘চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড’ এসে মিশেছিল দাউদকান্দিতে। এই দুই ঐতিহাসিক সড়কের সংযোগ ঘটে পাকিস্তান আমলে গজারিয়ার ওপর দিয়ে নির্মিত সড়কের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ সরকারের কাছে ঢাকা ও বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্ব পায়। ১৯৫৬ সালে প্রাদেশিক পরিষদে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। তৎকালীন গজারিয়া আসনের এমএলএ মনির হোসেন জাহাঙ্গীরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে এই দুই সড়কের সংযোগ সাধিত হয়। ১৯৬১-৬২ সালে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।
যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে ১৯৬৩ সালে, যখন প্রথমবারের মতো চালু হয় রো-রো ফেরি সার্ভিস। সে সময় গজারিয়ার পশ্চিম প্রান্তে তেতৈতলা এবং পূর্ব প্রান্তে চর বাউশিয়ায় দুটি ফেরিঘাট স্থাপিত হয়। ফেরি পারাপারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার সুবাদে এই দুই ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে জমজমাট দুটি বাজার।
সরেজমিনে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের তেতৈতলা পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের কর্মব্যস্ত এই ঘাটের এখন কেবল কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষটুকুই অবশিষ্ট আছে। ঘাটের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মতো কিছু চিহ্ন নদীর পাড়ে পড়ে থাকলেও নেই সেই চিরচেনা হাঁকডাক। বাজারে গুটিকয়েক দোকানপাট খোলা থাকলেও আগের মতো সেই উপচে পড়া ভিড় কিংবা লোকসমাগম এখন আর চোখে পড়ে না।
অন্যদিকে গজারিয়ার পূর্ব প্রান্তে বাউশিয়া ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। সেখানে ফেরিঘাটের কোনো স্মৃতিচিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই। দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণের সময় বাজারসংলগ্ন অধিকাংশ জায়গা অধিগ্রহণ করায় এক সময়ের জমজমাট বাজারটি এখন মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে যাওয়ার পথে। নদীর পাড়ে হাতেগোনা কয়েকটি দোকান টিকে থাকলেও সেগুলোকে কোনোভাবেই আর বাজার বলা চলে না।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু চালু হয়। মেঘনা সেতু ১৯৯১ সালে এবং গোমতী সেতু ১৯৯৫ সালে চালু হলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার সূচনা হয়। এর ফলে এসব নৌরুটে চলাচলকারী রো-রো ফেরির কার্যক্রম একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৫ মে দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু চালু হলে এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেনের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে সেই দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, “তখন এলাকায় শিল্পকারখানা ছিল না। ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করেই মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতো। কেউ পানি, কেউ ফল বা সবজি বিক্রি করত। বাজার দুটি ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র।”
তেতৈতলা বাজারের বর্তমান প্রজন্মের দোকানি মাজহারুল ইসলাম বলেন, “পূর্বপুরুষদের কাছে এই বাজারের স্বর্ণালী দিনের গল্প শুনেছি। এখন ফেরি নেই, তবে শুল্ক পয়েন্টে মালামাল ওঠানামা করায় কিছু লোকজনের আনাগোনা আছে। সেই ভরসাতেই টিকে আছে বাজারটি।”
চাঁদপুরের বাসিন্দা নাসির হোসেন পুরোনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, “ফেরি পার হওয়ার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো। তবে একবার ফেরি পার হতে পারলে ২০-২৫ মিনিটেই ঢাকা পৌঁছানো যেত। আজকের মতো অসহনীয় যানজট তখন ছিল না।”
বিষয়টি সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, “নদী দুটির ওপর একাধিক সেতু নির্মাণের ফলে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন হয়েছে। দ্রুততম সময়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য মানুষের প্রথম পছন্দ সেতু। প্রয়োজনীয়তা না থাকায় এই নৌরুটে ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
কেকে/এলএ