আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিঘাতে ইরানের পাল্টা হামলার মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম। চলমান এ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বন্ধ হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিতে প্রভাব পড়লে সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে পারে জ্বালানি তেলের দাম। তবে বিপিসি ও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এখনই তেল-জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা নেই।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট হলেও প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রণালিটি বন্ধ থাকে, তবে তা বৈশ্বিক শিপিং ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখনই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় নয়, পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। এ সময় জ্বালানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে জনসাধারণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় গতকাল সোমবার তেল ও গ্যাসের দাম তীব্রভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের পুঁজিবাজারগুলো খোলার আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকভিত্তিক ফিউচার ১.৬ শতাংশ পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর নাসডাক সূচক ১.৯ শতাংশ নিচে নেমে আসে। ইউরোপীয় পুঁজিবাজারে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানা সংস্থা—ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স গ্রুপের শেয়ার ১০ শতাংশ পড়ে যায়। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমের শেয়ারদর কমে ৭ শতাংশ। ফ্রান্সের হোটেল চেইন অ্যাকরের শেয়ার ৮.৫ শতাংশ মূল্য হারায়। নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ায় প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ১.৬ শতাংশ বেড়ে ৫,৩৬২ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান (গড়ে) ০.৬ শতাংশ শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-এর কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই তেল-জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার শঙ্কা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী ও মেসাঈদ শিল্পনগরীতে হামলার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম কোম্পানি কাতার এনার্জি গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ যে দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানি করে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতার। দুই দেশের মধ্যে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত ১৫ বছরের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে। পরে ২০২৩ সালে আরও একটি ১৫ বছরের চুক্তি হয়, যার আওতায় ২০২৬ সাল থেকে অতিরিক্ত ১.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি পাওয়ার কথা রয়েছে। এলএনজি স্থলপথে পরিবহন সম্ভব নয় বলে কাতার থেকে সরবরাহের প্রধান পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানায়, দেশের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে। দেশের একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগারের সক্ষমতার কারণে বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করা সম্ভব নয়। অপরিশোধিত তেল হিসেবে সৌদি আরব থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মারবান লাইট আমদানি করা হয়। এই দুই দেশের তেল সরবরাহও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে।
সরকারের এনার্জি অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্স ডিভিশনের হিসাবে দেশে বর্তমানে ৩০,৫৯১ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া ১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯১ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা জানুয়ারির একই সময়ে ৬৩ হাজার টনের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে জুন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই এবং আমরা আপাতত নিরাপদ অবস্থায় আছি। পরিশোধিত তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে, যার জন্য হরমুজ প্রণালির কোনো প্রভাব নেই। অপরিশোধিত বা ক্রুড তেলের ক্ষেত্রে প্রধান উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাই চলমান সংঘাতের প্রভাবকে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এ সময় আমাদের রিজার্ভে কোনো তেল সংকট নেই।’
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১৫ তারিখের মধ্যে আসা কার্গোগুলো ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ১৫–১৮ তারিখের মধ্যে ১–২টি কার্গো নিয়ে সাময়িক সংকট দেখা দিতে পারে।
এজন্য আমরা সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং বিকল্প পথে এলএনজি আমদানির উপায় খুঁজছি। তিনি বলেন, চলতি মাসে খোলা বাজার থেকে এলএনজি আমদানি করার কোনো পরিকল্পনা নেই; তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খোলা বাজার বা বিকল্প পথ ব্যবহার করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
কেকে/এলএ