চব্বিশের ৫ আগস্ট সিটি মেয়র পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। জন্ম সনদ থেকে মৃত্যু সনদ—সব ধরনের সেবা নিতে নগরবাসীকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। থমকে আছে নগর উন্নয়ন কাজও। নতুন প্রকল্প তো দূরের কথা, পুরানো অনেক প্রকল্পই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
নগরপিতা হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধি না থাকায় পদে পদে নানা জটিলতার শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের এই অচল অবস্থা নিরসনের জন্য নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক চান নগরবাসী।
স্থানীয় বিএনপির ৬ নেতা প্রশাসক হতে ইতোমধ্যে দেন দরবার শুরু করেছেন। তারা হলেন—বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন, সরকারি নিউ ডিগ্রি কলেজের সাবেক নির্বাচিত ভিপি ও বর্তমানে মহানগর বিএনপির সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানা, মহানগর ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে মহানগর বিএনপির সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইট এবং রাজশাহী কলেজের সাবেক নির্বাচিত ভিপি ও মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি বিএনপি নেতা মো. সাহিদ হাসান।
তারা প্রশাসক পদে নিয়োগ পেতে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের কেউ ঢাকায় অবস্থান করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, কেউ আবার রাজশাহী থেকে হাইকমান্ডের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তবে ছয় নেতার মধ্যে সাবেক নির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিকল্প দেখছে না দলের বেশিরভাগ ত্যাগী নেতাকর্মী থেকে শুরু করে নানা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয় নেতকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের ৬টি সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই নগরবাসী আশায় বুক বেধে ছিল রাজশাহীতে একজন যোগ্য নেতাকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দ্রুত নিয়োগ দেয়া হবে। রাজশাহীর স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে সিটি করপোরেশন চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে মাত্র দুজন নেতার। এর মধ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর মেয়র ছিলেন বর্তমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। তার বাইরে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সিটি করপোরেশন চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের। ৫ বছরের জন্য মেয়র নির্বাচিত হলেও তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে হয়রানিমূলক নানা মামলার আসামি হয়ে প্রায় ২৭ মাস জেল ও ফেরারী জীবন কাটিয়েছেন।
আরও জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের অসহযোগিতার পরও তিনি নগরবাসীর সেবা নিশ্চিতে সচেষ্ট ছিলেন। কোনো কিছুতেই তাকে দমাতে না পেরে পুলিশ কনস্টেবল সিদ্ধার্থ হত্যা মামলা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার সাজানো মামলার সঙ্গে তাকে গায়েবি মামলায় আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে ব্যবহার করে তাকে বরখাস্ত করেন। এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে তিনি আদালতের মাধ্যমে মেয়রের চেয়ার ফিরে পান। এরপর ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে করে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল কারচুপির সেই নির্বাচনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। সেই মামলা এখনো চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারণে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ত্যাগী নেতারা থেকে শুরু করে থানা ও ওয়ার্ড বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা সাবেক মেয়র বুলবুলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। মেয়র ও প্রশাসক হিসেবে তাদের প্রথম পছন্দ সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। প্রশাসক হিসেবে বুলবুলের প্রতি আস্থা রাখতে চান তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তারা সেই সমর্থনের কথা জানান দিচ্ছেন। সাবেক কাউন্সিলররাও প্রশাসক হিসেবে বুলবুলকেই চান।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্বাস আলী সরদার বলেন, “বুলবুলকে প্রশাসক করা না হলে তার ও নগরবাসীর সাথে অন্যায় করা হবে।”
১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. টুটুল বলেন, “নির্বাচিত মেয়র থাকাকালে অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক কারণে বুলবুলের নিকট থেকে মেয়র পদ কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আমরা চাই বুলবুলের মতো একজন অভিজ্ঞ নেতাকে রাসিকের প্রশাসক হিসেবে যেন নিয়োগ দেয়া হয়।”
যুবদল নেতা ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিইএবি) এর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আরিফুজ্জামান সোহেল বলেন, “এই মুহুর্তে দলমত নির্বিশেষে নাগরিক সেবা অর্থাৎ জনদুর্ভোগ দূর করতে দক্ষ প্রশাসক হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিকল্প কেউ নেই। তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে নগরবাসী উপকৃত হবে।”
রাজশাহী মহানগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের অধিকাংশ ত্যাগী নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে দাবি তুলেছেন—প্রশাসক বা মেয়র হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিকল্প নেই।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বলছেন, রাজশাহীতে সিটি কর্পোরেশন চালানোর মতো অভিজ্ঞতা একমাত্র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের রয়েছে।
তারা বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা ও নগর উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে রাজশাহীর চলমান ও অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো গতি পাবে। আর নতুন কোনো নেতাকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দিলে প্রশাসনিক কাজ বুঝে উঠতেই তাদের ৬ মাস কেটে যাবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না বরং জনোদুর্ভোগ বাড়বে। শুধু তাই নয়, নতুন কাউকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করলে দলের মধ্যে যে গৃহবিবাদ বা দ্বন্দ্ব রয়েছে—তা কয়েকগুন বাড়বে। আর এর প্রভাব পড়বে পরবর্তী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে।
বিএনপির ত্যাগী নেতারা বলছেন, দলের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির মামলা করতে পারেননি সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও তার দল আওয়ামী লীগ। বিগত আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে ৪২টি রাজনৈতিক মামলা মাথায় নিয়ে রাজনীতি করেছেন বুলবুল। এই সময়ের মধ্যে ৮ দফা তিনি জেলে গেছেন। জেলের বাইর থাকাকালে আওয়ামী লীগের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম ও দমন-পীড়নের মধ্যেও তিনি ছিলেন অবিচল। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বহুবার পুলিশি হামলার শিকার হয়ে রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ হন। সরকার পতন আন্দোলনে নেতাকর্মীদের তিনি আগলে রেখেছিলেন। ২০২৪ -এর জুলাই আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। নিজ দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে জুলাই যোদ্ধাদের সাথে নিয়ে সরকার পতন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন।
এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আনারস প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাবেক মেয়র ও বর্তমানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন। তার স্বল্প মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক প্রশস্তকরণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। বিদেশি দাতা সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে তিনি নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনের কাজও করেছেন।
কেকে/এজে