৫০ হাজার পিস ইয়াবা এবং সাড়ে চার লাখ নগদ টাকা জব্দ করেছে কক্সবাজার থানা। অন্যদিকে কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীসংলগ্ন কেওড়া বাগান থেকে মিয়ানমারের তৈরি একটি এসএমজি, ৩১ রাউন্ড গুলি ও ১৩টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে বিজিবি। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় প্রধান হিসেবে নাম উঠে এসেছে মো. শওকত নামের একজনের।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ভোর রাতের অভিযানে পুলিশ শওকতকে নারীসহ এক সহযোগীর সঙ্গে আটক করে।
তারা হলেন— সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খরুলিয়া সুতারচর এলাকার আলী আহমদের ছেলে মো. রাসেল (৪০) এবং রামু উপজেলার পশ্চিম মেরংলোয়া এলাকার আলমগীর প্রকাশ আলমের স্ত্রী কামরুন্নাহার (৩২)।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা এবং সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ জব্দ করা হয়।
শওকত কক্সবাজারের রামু উপজেলা যুবদলের সদস্য ও ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব। এছাড়াও তিনি উপজেলা যুবদলের অর্থসম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ইয়াবা ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
স্থানীয়দের মতে, শওকত কেবল এলাকার পরিচিত যুবদল নেতা নন, বরং মাদক চক্রের মূল হোতা হিসেবে নিজের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন তিনি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শওকতের অবৈধ ব্যবসা এতটাই বিস্তৃত ছিল যে অনেকেই এলাকায় তার উপস্থিতি নিয়ে ভীত ছিলেন। এই অভিযান প্রমাণ করে, যুবদল নেতা হওয়ার পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক চক্র পরিচালনা করে আসছিলেন।
রামু উপজেলা যুবদলের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, শওকত আলম সাবেক সভাপতি আবছার মেম্বার এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহিনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার বিরোধিতা করা কঠিন ছিল।
তারা বলেন, মাদকের অর্থ ব্যবহার করে শওকত স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেকে দৃঢ় অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমনকি ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচনের জন্যও তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, মাদক থেকে অর্জিত অর্থ তিনি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তার মাদক চক্র এতটাই সুসংগঠিত ছিল যে সাধারণ নজরদারিতে তা বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। পুলিশের এই অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে এবং দীর্ঘদিনের ভয় ও অনিশ্চয়তার কিছুটা অবসান ঘটিয়েছে।
স্থানীয় অনুসন্ধান ও সূত্র বলছে, শওকত দীর্ঘদিন সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের জন্য একটি জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। টেকনাফ ও ঢাকার শীর্ষ কয়েকজন মাদক কারবারির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করে তিনি নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল মাদক ব্যবসায়ীই নন, বরং এলাকার নতুন ‘জমিদার’ হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জমি বিক্রির খবর পেলেই শওকত তা কেনার জন্য ছুটে যেতেন। কয়েক বছর আগেও তার কাছে এমন সম্পদ তো দূরের কথা, বৈধ আয়ের কোনো উৎসই ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে জেলার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে মাদকের টাকায় তিনি নতুন ধনকুবেরে পরিণত হন। মাদক চক্র আড়াল করতে তিনি দুই বছর ধরে খরুলিয়া এলাকায় একটি ফার্নিচার ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। যুবদলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ মাদক বাণিজ্য চালাতেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, এই চক্র থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে শওকত আলম একাধিক বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা করেছেন বলে। এ ধরনের অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার করেছেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছমি উদ্দিন বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানকালে মুক্তারকুল এলাকার হানিফের ছেলে আলমগীর পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রীসহ শওকত ও অন্য সহযোগীকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ও সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন যে সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন।’
এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীসংলগ্ন কেওড়া বাগান থেকে মিয়ানমারের তৈরি একটি এসএমজি, ৩১ রাউন্ড গুলি ও ১৩টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে বিজিবি। তবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ভোরে এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন উখিয়াস্থ ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম।
তিনি জানান, টেকনাফের জিম্বংখালী নাফ নদীসংলগ্ন কেওড়া বাগান এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনার তথ্য পেয়ে বিজিবি টহল জোরদার করে। বুধবার বিকেলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে জিম্বংখালী বিওপি কমান্ডারের নেতৃত্বে একটি বি-টাইপ টহল দল বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানে সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি না পাওয়া গেলেও পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি এসএমজি, ৩১ রাউন্ড গুলি এবং ১৩টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অস্ত্র, গুলি ও ম্যাগাজিন টেকনাফ মডেল থানায় আলামত হিসেবে জমা করা হয়েছে।
জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘চোরাচালান প্রতিরোধ ও যেকোনো সন্ত্রাসী অপতৎপরতা রোধে উখিয়া ব্যাটালিয়ন সর্বদা তৎপর রয়েছে। সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে। সীমান্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।’
কেকে/এসএ