মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারেও। খুলনার দৌলতপুরে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপোগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ লাখ লিটার জ্বালানি তেল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, যশোর, বরিশালসহ ১৬টি জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে গত কয়েকদিনে হঠাৎ করেই এ তেলের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ফলে ডিপোগুলোর সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
জ্বালানি তেল পরিবেশক ও পেট্রোল পাম্প মালিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে কিংবা দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই অনেকেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করছেন। এ কারণে হঠাৎ করে বাজারে তেলের চাহিদা বেড়ে গিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
খুলনার দৌলতপুরে যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি তেল নিতে আসা ট্যাংকারের দীর্ঘ লাইন। আগে যেখানে দিনে প্রায় ৫০টি গাড়িতে তেল লোড করা হতো, সেখানে এখন প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০টি ট্যাংকারে তেল লোড হচ্ছে। তবুও অনেক গাড়িকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ডিপো সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে দিনে এখানে ১৩ লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ১ লাখ ৭৬ হাজার লিটার পেট্রোল এবং ১ লাখ ১৯ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
পেট্রোল পাম্প মালিকদের ভাষ্য, অনেকেই প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে মজুত রাখছেন। ভবিষ্যতে সংকট দেখা দিলে কিংবা দাম বাড়লে যেন সরবরাহ বজায় রাখা যায়, সে প্রস্তুতিই নিচ্ছেন তারা।
তবে এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষের মধ্যে তেল মজুত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক যানবাহন মালিক দৈনন্দিন প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ তেল কিনছেন। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং কিছু জায়গায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে।’
অন্যদিকে ডিপো কর্তৃপক্ষ বলছে, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যমুনা অয়েল ডিপোর সেলস ম্যানেজার আবদুল বাকী জানান, প্রতিদিনই মাদার ভেসেল থেকে ডিপোতে তেল আসছে। শুধু খুলনার যমুনা ডিপোতেই বর্তমানে কোটি লিটারের বেশি জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ইতোমধ্যে সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১৪ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের।
তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প বাজার থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমান মজুত পরিস্থিতিতে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই।
এদিকে জ্বালানির পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার এলএনজি থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বুধবার তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে করে ঈদের ছুটি পর্যন্ত সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র আরও জানায়, চলতি বছরে ১১৫টি কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি এবং ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। এ ছাড়া খোলাবাজার থেকে আরও ৫৯টি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ কাতার থেকে বাংলাদেশে আসা অধিকাংশ এলএনজি এই পথেই পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কাতার সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে বলেও জানা গেছে।
এর মধ্যেই গত বুধবার একটি নতুন কার্গো থেকে এলএনজি নেওয়া হয়েছে টার্মিনালে। এ ছাড়া ৫, ৯ ও ১১ মার্চ আরও তিনটি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এ মাসে মোট আরও পাঁচটি কার্গো আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৫ ও ১৮ মার্চ কাতার থেকে দুটি কার্গো আসার কথা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। আর তার প্রভাব বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
কেকে/এসএ