বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য আজ এক গভীর বাস্তবতা। উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, সমাজের এক বড় অংশ এখনো দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে জীবনযাপন করছে। সম্পদ ক্রমেই অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
এ বাস্তবতায় মানবসভ্যতা নতুন নতুন অর্থনৈতিক মডেলের খোঁজ করছে। অথচ ইসলাম বহু আগেই এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সামাজিক ন্যায়, মানবিক ভারসাম্য এবং সম্পদের ন্যায়সংগত প্রবাহ। সেই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জাকাত।
জাকাত কী ও কাদের অধিকার?
ইসলামে জাকাত শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি বাস্তব পদ্ধতি। নামাজের মতো এটিও একটি ফরজ বিধান। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক কোনো মুসলমানের কাছে বছরান্তে তার সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ (২.৫% বা আড়াই শতাংশ) শরিয়ত নির্ধারিত খাতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করাকে জাকাত বলে। পবিত্র কুরআনে জাকাত ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট আটটি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—
‘জাকাত শুধু ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ (ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট) করা প্রয়োজন তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর বিধান।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৬০)।
এ খাতগুলো নিশ্চিত করে যে, জাকাতের অর্থ যেন সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় কাজে লাগে।
ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়
নামাজ যেমন মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, তেমনি জাকাত সমাজের ভেতরকার বৈষম্য দূর করার পথ তৈরি করে। তাই পবিত্র কুরআনুল কারিম-এ বহু জায়গায় নামাজ ও জাকাতকে পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে : ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩)।
এর মধ্যদিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, ইসলাম ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বকেও সমান গুরুত্ব দেয়।
ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি ও সুদমুক্ত অর্থনীতি
ইসলামি অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা হলো, সম্পদের প্রকৃত মালিক মানুষ নয়, বরং আল্লাহ। মানুষ শুধু তার আমানতদার। এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পদ ব্যবহারে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে।
ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের স্থবিরতা দূর করা। যখন সম্পদ শুধু ধনীদের হাতেই ঘুরতে থাকে, তখন সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হয়। এ ছাড়া সুদভিত্তিক অর্থনীতি ধনীর সম্পদকে আরও বাড়িয়ে দেয়, আর দরিদ্র মানুষকে ঋণের বোঝায় আরও অসহায় করে তোলে। ইসলামি অর্থনীতিতে সুদকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ঘোষণা :
‘আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং সুদকে অবৈধ করেছেন।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৭৫)।
সুদভিত্তিক অর্থনীতি ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও দুর্বল করে। তার বিপরীতে জাকাত সম্পদকে শুধু ধনীদের হাতে স্থবির হতে দেয় না, বরং সমাজের ধনী গরিবের বৈষম্য ভেঙে অবিরাম প্রবাহিত করে।
দারিদ্র্য বিমোচনে উৎপাদনমুখী জাকাত
জাকাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি গ্রহীতাকে একসময় দাতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই জাকাত দেওয়া হয় ব্যক্তিগতভাবে, তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য। এতে সাময়িক উপকার হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসে না।
দরিদ্র ও অভাবী মানুষগুলোকে (জাকাতের নির্ধারিত আট খাতের অন্তর্ভুক্ত) শুধু একবেলা খাবার বা শাড়ি-লুঙ্গি না দিয়ে, যদি তাদের কারিগরি শিক্ষার খরচ বা ক্ষুদ্র ব্যাবসার পুঁজি হিসেবে জাকাতের অর্থ প্রদান করা হয়, তবে শরিয়তের বিধানও পালিত হলো, আবার সেই মানুষটিও স্থায়ীভাবে অভাবমুক্ত হওয়ার সুযোগ পেল। উদাহরণস্বরূপ, একজন জাকাত পাওয়ার যোগ্য যুবককে যদি কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হয় এবং জাকাতের অর্থ দিয়ে তাকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া হয়, তবে সে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে। এতে করে সে আর সমাজের বোঝা থাকবে না, বরং কয়েক বছর পর সে নিজেই জাকাত দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করবে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও জাকাতের সম্ভাবনা বিশাল। প্রতিবছর দেশে যে বিপুল পরিমাণ জাকাত আদায় হয়, তার বড় অংশই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যয় হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (ওংউই)-এর বিভিন্ন গবেষণায়ও জাকাতভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেশেও যদি একটি স্বচ্ছ ও সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অর্থকে নির্দিষ্ট খাতের মানুষের জন্য উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হতে পারে।
জাকাতকে শুধু দান বা সাময়িক সহায়তা হিসেবে না দেখে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত প্রয়োগের মাধ্যমে জাকাত একটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। আজকের বৈষম্যপীড়িত বিশ্বে জাকাত শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, বরং একটি বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক ভারসাম্য যার এক অনন্য উদাহরণ হলো জাকাত।
লেখক : শিক্ষার্থী, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/এসএ