মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
উন্নয়ন ভাবনায় নতুন প্রশ্ন : পার্পল অর্থনীতি
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ১০:০৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

অর্থনীতির প্রচলিত আলোচনায় আমরা সাধারণত উৎপাদন, শিল্পায়ন, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতো সূচকগুলোকেই উন্নয়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু সমাজের ভেতরে এমন এক বিশাল শ্রমক্ষেত্র রয়েছে, যা অর্থনীতির মূলধারার পরিসংখ্যানে প্রায় অদৃশ্য। 

শিশু লালন-পালন, বয়স্কদের দেখাশোনা, অসুস্থ মানুষের সেবা কিংবা ঘর-সংসারের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি কাজের মাধ্যমেই মূলত সমাজের জীবনচক্র সচল থাকে। অথচ এই শ্রমের অধিকাংশই অবৈতনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে থেকে যায়। এই অদৃশ্য শ্রমকে অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা থেকেই আধুনিক অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে পার্পল অর্থনীতি বা বেগুনি অর্থনীতি।

পার্পল অর্থনীতি মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে যত্নভিত্তিক শ্রম বা ‘কেয়ার ওয়ার্ক’-কে অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিশেষ করে নারীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে বিপুল অবৈতনিক শ্রমের চাপ রয়েছে, সেই বাস্তবতাকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসাই এই ধারণার মূল লক্ষ্য। প্রচলিত অর্থনীতিতে উৎপাদনকে প্রধানত বাজারভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে পরিবারের ভেতরে পরিচালিত অসংখ্য শ্রম, যা মূলত নারীরাই সম্পাদন করেন, তা অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়ে নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ঘণ্টা অবৈতনিক কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষের ব্যয় মাত্র ০.৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি সময় দিয়ে নারীরা এ অদৃশ্য অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। রান্না, শিশুদের দেখাশোনা, পরিবার ব্যবস্থাপনা কিংবা বয়স্কদের সেবার মতো কাজগুলো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত না হলেও বাস্তবে এগুলো ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক কাঠামোই টিকে থাকতে পারে না।

অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, যদি এই অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তবে তা অনেক দেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠতে পারে। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী অবৈতনিক যত্নশ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির প্রায় ৯ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সমপরিমাণ হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব কম নয়। সাম্প্রতিক এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে অবৈতনিক কাজের বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ৬.৭ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে নারীর শ্রম থেকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ‘হাউসহোল্ড প্রোডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টস’ (এইচপিএসএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বিপুল অংক দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।

এই বাস্তবতা থেকেই পার্পল অর্থনীতি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, অর্থনীতির মূল্যায়নে কেন শুধু বাজারভিত্তিক উৎপাদনই গণ্য হবে, মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য যত্নশ্রম কেন নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পার্পল অর্থনীতি, যত্নভিত্তিক শ্রম বা ‘কেয়ার ওয়ার্ক’-কে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেয়।

পার্পল অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো অবৈতনিক যত্নশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেই শ্রমের বোঝা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, পরিবারে যত্নের দায়িত্ব প্রায় পুরোপুরিই নারীর ওপর ন্যস্ত থাকে। ফলে নারীরা অনেক সময় শ্রমবাজারে সমান সুযোগ পান না, কর্মজীবনে অগ্রসর হতে পারেন না এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েন। পার্পল অর্থনীতি মূলত এই বৈষম্য দূর করতেই রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এই ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো যত্নসেবা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। ডে-কেয়ার সেন্টার, নার্সিং সেবা, প্রবীণদের জন্য বিশেষ সেবাকেন্দ্র কিংবা পারিবারিক সহায়তা কর্মসূচির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক যত্নশ্রমের চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে। এসব ব্যবস্থার ফলে যত্নশ্রমের দায়িত্ব কেবল পরিবারের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থেকে আংশিকভাবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে স্থান পায়। এর ফলে পরিবারগুলো যত্নশ্রমের দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে পারে এবং বিশেষ করে নারীরা কর্মক্ষেত্রে আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।

তবে এই বিশাল শ্রম বৈষম্যের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোই দায়ী নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সামাজিক রীতিনীতি বা ‘সোশ্যাল নর্মস’। গবেষণায় দেখা যায়, সমাজে প্রচলিত বর্ণনামূলক, আদেশমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি নারীর ওপর ঘরোয়া কাজের অধিকাংশ দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। পরিবার ও সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রে ধরে নেয় যে ঘরের কাজ নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব, কোনো শ্রম নয়। ফলে দিনের বড় একটি সময় নারীদের চলে যায় রান্না, শিশুদের দেখাশোনা কিংবা পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পেছনে। এই অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে অনেক সময় তারা নিজের শিক্ষা, কর্মজীবন কিংবা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েন। এভাবেই ধীরে ধীরে নারী ও পুরুষের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বৈষম্য তৈরি হয়, যা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের পথকে সংকুচিত করে।

এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দেন। অর্থাৎ স্বীকৃতি, হ্রাস এবং পুনর্বণ্টন। প্রথমত, অবৈতনিক যত্নশ্রমকে একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সামাজিক সেবার মাধ্যমে এই কাজের চাপ কমাতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে এই দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। অনেক গবেষক তাই ঘরোয়া সেবা কাজকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক অবকাঠামো’র অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। শিশু যত্ন কেন্দ্র, প্রবীণ সেবা কেন্দ্র এবং সহজলভ্য পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থার মতো অবকাঠামো নারীর কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

তবে পার্পল অর্থনীতির বাস্তবায়ন যে সহজ, তা বলা যাচ্ছে না। সামাজিক মানসিকতা এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ধারণা অনেক সময় এই পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সমাজেই এখনো ঘরের কাজকে নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়, শ্রম হিসেবে নয়। ফলে এই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ কিংবা নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ অনেক সময় উপেক্ষিত হয়।

তবুও বর্তমান বিশ্বে পার্পল অর্থনীতির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কারণ উন্নয়নের ধারণায় এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদাও জড়িত। এই ধরনের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই নারীর শ্রমের মূল্যায়নের পাশাপাশি একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার পথে একধাপ অগ্রসর হওয়া।

সবশেষে বলা যায়, পার্পল অর্থনীতি মূলত অর্থনীতিকে নতুনভাবে ভাবার একটি প্রচেষ্টা, যেখানে মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও মানবিক, সমতাভিত্তিক ও টেকসই করে তোলা। অবৈতনিক যত্নশ্রমকে অর্থনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া গেলে নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সমতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় হতে পারে। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চিন্তায় তাই পার্পল অর্থনীতি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/এসএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  উন্নয়ন ভাবনা   নতুন প্রশ্ন   পার্পল অর্থনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close