কক্সবাজারের পেকুয়াতে বাবা মারা যাওয়ার পর মেয়ে তার পৈত্রিক সম্পদের ভাগ চাইতে গিয়ে মামলা করতে গেলে পেকুয়া থানায় মা-মেয়ে নাজেহাল হয়েছেন এমন অভিযোগ উঠেছে। এমনকি থানায় ইউএনওকে ডেকে এনে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে ১ মাসের জেল দিয়েছে বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) কক্সবাজারের পেকুয়ায় পৈতৃক সম্পদের মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মা ও মেয়েকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী
কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন পেকুয়া উপজেলার সাবেক গুলদি এলাকার মৃত নুরুল আবছারের স্ত্রী রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮) ও তার মেয়ে কলেজ শিক্ষার্থী জুবাইদা।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নামে পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনটি তাদের বিপক্ষে গেলে বুধবার (৪ মার্চ) জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়ে ঘুষের টাকা ফেরত চান।
মারধরের অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, টাকা ফেরত চাওয়ায় এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা-মেয়েকে থানা কম্পাউন্ডেই চড়-থাপ্পড় ও মারধর করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে রেহেনা মোস্তফার চোখে ও মুখে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
ইউএনও-র ভূমিকা ও কারাদণ্ড
ঘটনার কিছুক্ষণ পর পেকুয়া থানার ওসি-র ফোন পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম থানায় আসেন। ভুক্তভোগীরা ঘুষের বিষয়টি জানালেও তিনি তা আমলে না নিয়ে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা ও মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
ইউএনও মাহবুব আলম ঘুষের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে উল্লেখ করেছেন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় তাৎক্ষণিক এই সাজা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম দাবি করেছেন যে, মা-মেয়ে থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলা করেছেন।
বর্তমানে মা ও মেয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনাকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করে এর সুষ্ঠু তদন্ত এবং মা-মেয়ের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।
জুবাইদার পটভূমি
জানা যায়, কক্সবাজারের চকরিয়া সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জুবাইদা। জুবাইদার বয়স যখন ১ বছর বা তারও কমবেশি হবে, তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
জুবাইদার বাবা যৌতুক চেয়ে তার মাকে নির্যাতন করেছিল বলে বিচ্ছেদ হয়েছিল। জুবাইদাকে নিয়ে তার মা বাপের বাড়ি ফিরে যান।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করে নতুন সংসার করেন জুবাইদার বাবা। জুবাইদার মা সংসারী হন, তবে মেয়ের পেছনে সংগ্রাম করেন। মূলত তাকে পড়ালেখা করিয়ে বড় করবেন সেই আশায় কষ্ট করেন। ২০১৩ সালের ২৩ মে জুবাইদার বাবা মারা যান।
অফিসিয়ালি জুবাইদা এতিম হন। জুবাইদা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার স্থাবর সম্পত্তির দাবিদার। কিন্তু তার চাচারা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন।
ওয়ারিশ সনদ সংক্রান্ত সমস্যা
ইউনিয়ন পরিষদ তার ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ওয়ারিশ সনদ প্রদান করে। জুবাইদাকে সেই ইউনিয়ন পরিষদ ওয়ারিশ সনদ প্রদান করতে অস্বীকার করেন। জুবাইদার চাচা ও ফুফুদের মাধ্যমে বিষয়টি জটিল হয়।
সম্পত্তি উদ্ধারের প্রয়াস
এসিল্যান্ড হয়ে তদন্তভার চলে যায় পেকুয়া থানার পুলিশের কাছে। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পল্লব কুমার ২০ হাজার টাকা ঘুষ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথভাবে দেবেন না। খালার সোনার আন্টি বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পরেও জুবাইদার পিতৃপরিচয় স্বীকার করেনি পুলিশ। পিতৃপরিচয় স্বীকার না করা মানেই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নেই।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) জুবাইদা তার মাকে নিয়ে থানায় যান। ফেরত চাওয়া ২০ হাজার টাকার বিষয়ে পুলিশ মা-মেয়ের ওপর চড়াও হন। মা-মেয়েকে মারধর করে, ইউএনওকে ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ১ মাসের সাজা কার্যকর করেন। জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। স্বাধীনভাবে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
সমাপ্তি
জুবাইদার পিতৃপরিচয় স্বীকার হলে সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাবেন। এই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য জুবাইদার চাচা ও ফুফুর সহযোগিতায় বিষয়টি জটিল করা হয়েছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
কেকে/এলএ