দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রদল নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঁদাবাজি, হামলা, নির্যাতন ও উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। কোথাও সরকারি প্রকল্পের ট্রাক আটকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি, কোথাও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও ‘টর্চার সেল’ চালিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছেন নেতারা।
এসব ঘটনায় কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং সংগঠন থেকেও নেওয়া হয়েছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। একইসঙ্গে কিছু এলাকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবুও থামছে না এসব চাঁদাবাজি। দিনদিন চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে সংগঠনটির ছাত্রনেতারা।
অতিসম্প্রতি সিলেটের জৈন্তাপুরে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রহমত মারুফ নামের ওই নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। গ্রেপ্তারের আগে সংগঠন থেকেও বহিষ্কৃত হয়েছেন ওই নেতা।
এদিন সন্ধ্যায় রহমত মারুফের বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাটের বাসিন্দা ট্রাকচালক মাহফুজুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় চাঁদা দাবি এবং চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় মারধর ও ট্রাক ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার পরপরই রহমত মারুফকে বহিষ্কার করে ছাত্রদল।
অন্যদিকে চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের তিন নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় ঠিকাদারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।
ছাত্রদল নেতাদের দাবি, ঠিকাদারের কাজের অনিয়মের বিষয় সামনে আনায় তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ছাত্রদলের তিন নেতা হলেন—বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজা শরীফ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন ও ছাত্রদল নেতা (কমিটিতে পদ নেই) আজমাইন সাকিব।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতারা বলেন, কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে আপত্তি তুললে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঠিকাদার পক্ষের বিরোধ হয়। এর জেরেই নিজেদের দায় এড়াতে থানায় এ ধরনের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ধারা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি এ বি এম আওলাদ হোসেন ২ মার্চ নগরের বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মেসার্স ধারা এন্টারপ্রাইজ ও বিল্ডার্স কন্ট্রাক্টস অ্যান্ড সাপ্লায়ার—এ দুই প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১-এর সামনে আরসিসি সড়ক নির্মাণকাজের কার্যাদেশ পেয়ে কাজ শুরু করে। কাজটি স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চলছিল।
১ মার্চ সকাল ১০টার দিকে ছাত্রদল নেতা আজমাইন সাকিবের নেতৃত্বে উল্লিখিত বিবাদীরা এবং অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জন সেখানে এসে কাজে বাধা সৃষ্টি করেন।
এ সময় তারা কাজের ভাগের টাকা হিসেবে চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকার করলে বিবাদীরা ক্ষিপ্ত হয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন এবং ঠিকাদারকে গালাগালসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দেন।
আওলাদ হোসেনের অভিযোগ, এসব কাজের নেপথ্যে রয়েছেন ছাত্রদল নেতা রেজা শরীফ। তার নেতৃত্বেই এগুলো ঘটে। চাঁদা চাওয়ার কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে আওলাদ হোসেন বলেন, “আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। যারা চাঁদা চায়, তাদের চেনার জন্য আমি একটি ছবি তুলেছিলাম। সেটাও ছাত্রদল নেতা আজমাইন সাকিব আমার কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ডিলিট করে দিয়েছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজা শরীফ বলেন, “ঠিকাদার অন্যায়ভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করলে ছাত্রদলের আজমাইন সাকিবসহ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। ঠিকাদার বরিশালের বিভিন্ন নেতাদের দিয়ে আমার কাছে নালিশ করিয়েছেন। কয়েক দিন পর ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি, ভালো মানের পাথর ও মালামাল আনা হচ্ছে।”
তিনি তখন ঠিকাদারকে বলেন, “ভালো মানের পাথর, বালু ও রড দিয়ে কাজ করলে তো কেউ কাজ বন্ধ করতে আসত না। ভালো সামগ্রী দিয়ে কাজ করুন। তার সঙ্গে আমার টাকা-পয়সা বা চাঁদাসংক্রান্ত কোনো কথাই হয়নি।”
এ প্রসঙ্গে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ঠিকাদারের প্রতিনিধি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি-দোকান দখল ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগে এক বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসী।
বৃহস্পতিবার উপজেলা সদরের শহীদ মিনার সড়কে তার অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। মানববন্ধনে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা মাহফুজুল ইসলাম উজ্জ্বল, তার ভাই চঞ্চল, ভাগনে তালিব ও সহযোগী রতনসহ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
তাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, নিরীহ মানুষের জমি ও দোকান দখল, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং নারীদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের টার্গেট করে হয়রানি করে তারা।
সমাবেশে বক্তব্য দেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আব্দুল হাই মৃধা ও শহিদুল ইসলামসহ জেলা ও পৌর যুবদল এবং সাবেক ছাত্রদল নেতারা। তারা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে অভ্যুত্থানের পর উজ্জ্বলকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবুও সে প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে মাহফুজুল বলেন, তার প্রতিবেশী আ. হাই মৃধার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ চলছে। মৃধার নেতৃত্বে একটি চক্র তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এর আগে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিজবুল আলম জিয়েসের ‘টর্চার সেল’-এর সন্ধান মেলে, যেখানে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মধ্যে ওই ছাত্রদল নেতার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মামুন সরকার সোমবার দুপুরে জিয়েসকে প্রধান আসামি এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে তারাকান্দা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
কেকে/এলএ