মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দিশেহারা ছোট খামারিরা
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কমে যাওয়ায় দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা চরম সংকটে পড়েছেন। টানা চার মাস ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবার খরচই তুলতে পারছেন না তারা। প্রতি ডিমে যেখানে উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়। মাসের পর মাস এভাবে লাখ লাখ টাকা লোকসান, ঋণের চাপ, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। অনেকে খামার গুটিয়েছেন, কেউবা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পরিবার ছাড়া অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে একের পর এক ছোট ও প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাবে। তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপরও। এখনই যদি উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের দাম নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে পুরো পোল্ট্রি খাতই গভীর সংকটে পড়বে।

খামারিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, ডিম ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আর দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রে ধ্বংসের মুখে এই খাত। এ মুহূর্তে সরকার যদি ডিমের দাম নির্ধারণ করে না দেয়, তাহলে এই খামারিরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম চকদার। এক সময় খামারই ছিল যার সবকিছু, এখন তিনি একটি ভবনে দারোয়ানের কাজ করে জীবিকা চালাচ্ছেন। জানতে চাইলে রবিউল বলেন, ‘যৌবনের সব শক্তি দিয়ে খামার দাঁড় করিয়েছিলাম। আমার অধীনে কয়েকজন কর্মচারী ছিল। এখন আমি নিজেই দারোয়ানের কাজ করি। খামার করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হই। রোগবালাই আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও খামার টিকিয়ে রাখি। হয়তো ভাবছিলাম ভালো সময় আসবে। কিন্তু সেই ভালো সময় আসেনি, এত খারাপ সময় এসেছে যে বাড়িছাড়া হতে বাধ্য হয়েছি। সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরি। অথচ সহযোগিতা পেলে হয়তো আমার এই করুণ দশা হতো না।’

জেলার হাজারো খামারির অবস্থা একই। যারা টিকে আছেন, তাদেরও এখন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। না পারছেন খামার চালিয়ে নিতে, না পারছেন বন্ধ করতে। ভাষায় যেন প্রকাশ করতে পারছেন না তারা।

‘ডিমের রাজধানী’ খ্যাত টাঙ্গাইল জেলাজুড়ে এমন পরিস্থিতি আসবে তা কখনো কল্পনাও করেনি কেউ। কয়েক বছর আগেও মুরগির কোলাহল আর খামারিদের কর্মব্যস্ততায় সময় কাটত জেলাজুড়ে। সচ্ছলতায় দিন কাটত সবার। সেই সঙ্গে খামারের সঙ্গে যুক্ত থেকে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ একাধিক উপজেলার খামারিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ডিমের বাজার মন্দা থাকায় গত চার মাস ধরে লোকসান গুনছেন খামারিরা। ঋণগ্রস্ত হয়ে কেউ কেউ খামার বন্ধ করে নিজেকে আড়াল করছেন। কেউ কেউ অন্য পেশায় কাজ করে কোনোমতে টিকে আছেন। টিকে থাকার এই লড়াইয়ে সবাই খুবই ক্লান্ত। ২০ জনেরও অধিক খামারি জানিয়েছেন, বাজার ব্যবস্থা ও তাদের পাশে সরকার না দাঁড়ালে হয়তো ঈদের পরে সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে এলাকাছাড়া হয়ে থাকতে হবে।

খামারিরা জানান, তারা মূলত দুইভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছেন। ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না; সময়মতো চিকিৎসাসেবা না পেয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে খামারের হাজার হাজার মুরগি মারা যাচ্ছে। তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সরকারের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা তারা পান না।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু টাঙ্গাইল নয়, দেশজুড়েই পোল্ট্রি খামারিদের এমন করুণ অবস্থা। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলোকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এদের জন্য বিপণন সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেমন কৃষিতে বিশেষ কিছু ফসলের ক্ষেত্রে মাত্র ৪ শতাংশ হার সুদে ঋণের ব্যবস্থা আছে, ক্ষুদ্র খামারিদের জন্যও এমন স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে ডিম ও মুরগি উৎপাদন করতে পারায় তাদের খরচ কম হলেও ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হয়। অনেক সময় রোগবালাই বা লোকসানের মুখে পড়ে খামার বন্ধ হয়ে গেলে প্রান্তিক খামারিরা আর উৎপাদনে ফিরতে পারেন না। কেননা বড় খামার মালিকেরা সহজে সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং ঋণ পেলেও ছোট খামারিরা তা পায় না।’

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেক সময়ে বড় বাণিজ্যিক খামারের মালিকেরা জোটবদ্ধ হয়ে কারসাজির মাধ্যমে ডিম ও মুরগির দাম বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হবে। যদি দেশের সব জায়গায় উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে, তবে বড় খামারিদের পক্ষে এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)-এর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দুই যুগের বেশি সময় ধরে এসব প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রম আর ত্যাগের কারণেই আমরা এখন পর্যন্ত কম দামে প্রোটিনের অন্যতম উৎস ডিম ও মুরগি কিনে খেতে পারছি। তাদের হাত ধরেই প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প দাঁড়িয়েছে। অথচ এখন তারা উপেক্ষিত, বঞ্চিত, অসহায়। এসব খামারিদের যদি আমরা টিকিয়ে না রাখতে পারি তবে পোল্ট্রি খাত সংকটে পড়বে। হাতেগোনা কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে যাবে গোটা শিল্প। তখন তাদের বেধে দেওয়া দামেই আমাদের ডিম ও মুরগি কিনে খেতে হবে। এতে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বেন ভোক্তারা।’

দ্রুত সময়ের মধ্যে এর সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান কৃষক কার্ড বিতরণে যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পোল্ট্রি খামারিদের রাখা হয়। ঋণ ও ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করে প্রান্তিক খামারিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এতে একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল হবে, অপরদিকে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হবে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।’

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এলাকার প্রান্তিক খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সম্প্রতি মুরগির ডিম বিক্রি করেছি সাড়ে ৬ টাকায়। অথচ প্রতিটি ডিমে আমার উৎপাদন খরচ হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা। এভাবে গত ৪ মাস ধরে লসে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমানে এই লস বহন করার মতো কোনো শক্তি আমার নেই।’ 

তিনি বলেন, ‘আমরা যারা প্রান্তিক খামারি, একদিন বয়সি যে বাচ্চা কিনি সেটার মূল্য অনেক বেশি। বর্তমানে খামারে আমার যে বাচ্চা আছে সেটার ক্রয়মূল্য ছিল ১০৫ টাকা। এরপর এসব বাচ্চাকে ১৮ সপ্তাহ লালন-পালন করতে হয়েছে। এরকম এক হাজার মুরগি পালতে আমার সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়। বর্তমানে আমার মুরগির উৎপাদন ৯০ শতাংশ। আমি না পারছি এই মুরগিগুলো বিক্রি করতে, না পারছি খরচ তুলতে। আগে আমার খামারে তিনজন কর্মচারী ছিল, বর্তমানে একজন আছে। অন্য দুজনকে বাধ্য হয়ে বাদ দিতে হয়েছে। কারণ ডিম বিক্রি করে আমার মুরগির খাবারের টাকাই ওঠে না, আমি কর্মচারীর বেতন দেব কীভাবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘বড় বড় কোম্পানিগুলো যেভাবে মুরগির খাদ্য ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে তাতে আকাশ-পাতাল তফাৎ থাকে। এক কেজি প্রোটিনের মূল্য ৯০ টাকা, কিন্তু এই প্রোটিন খামারিকে কিনতে হয় ২১০ টাকায়। এভাবে সবদিকেই প্রান্তিক খামারিদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়। সরকারের কাছে আবেদন এই বৈষম্য দূর করতে হবে এবং আমাদের ডিমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।’ 

অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর কঠিন সময় পার করা খামারিদের দিকে নজর না থাকলেও সংশ্লিষ্ট খাতের বড় বড় কোম্পানির পক্ষে ঠিকই নীতিমালাসহ নানাভাবে সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ভর্তুকিসহ নানা সুবিধা বড় কোম্পানিগুলোই পেয়ে থাকে। সম্প্রতি অনুমোদন পাওয়া পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালাতেও নেই খামারিদের পক্ষে যুগোপযোগী পদক্ষেপের কথা। বরং প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে শর্তারোপ জুড়ে দিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।  

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান বলেছেন, আগের তুলনায় খামারের সংখ্যা কমেছে। পোল্ট্রি খাতের সুরক্ষায় নীতিমালাটি বড় ভূমিকা রাখবে।

২৪ বছর ধরে এই পেশায় জড়িত আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে খামারে আমার প্রতিদিন লস হচ্ছে ৪০ হাজার টাকার বেশি, প্রতি মাসে লস যাচ্ছে ৪ লাখ টাকার ওপরে। আমি গত তিন মাস ধরে বিদ্যুৎ বিল দিতে পারিনি, ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বিল বাকি আছে। এখন ডিম বিক্রি করে মুরগির খাবার খরচও জোটে না, কর্মচারীর বেতন দিতে পারি না।’

বিপিআইএ এর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী প্রান্তিক খামারিদের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার পলিসিটা ভিন্নভাবে করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক খামারিদের পণ্য বিক্রিতে যেন কোনো ধরনের ট্যাক্স বা ভ্যাট না থাকে। তবে যারা বড় করপোরেট খামারি রয়েছেন তাদের জন্য ভিন্ন ট্যাক্স ধার্য করা যেতে পারে, যেন প্রান্তিক খামারিরা তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।’ 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  দিশেহারা   খামারি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close