দীর্ঘ ১৮ মাস সাংগঠনিক স্থবিরতার পর ফের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরের দিন থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তরসহ দেশের জেলা ও উপজেলায় দলের তালা খুলে দোয়া-মোনাজাত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টাঙানোর কাজ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
আবার, কোথাও দেখা গিয়েছে দলের দপ্তর খুলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের দপ্তর খোলার সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের বাধা, ভাঙচুর বা পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। বরং বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগ প্রশ্নে কৌশলী ও নমনীয় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারির ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশের ভেতরে আত্মগোপনে ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে চলতি মাসের ৭, ১৭ ও ২৬ মার্চে কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশ অনুযায়ী ঐতিহাসিক ৭ মার্চের উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
নওগাঁয় আ.লীগ কার্যালয়ে বাজল ৭ মার্চের ভাষণ
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নওগাঁ জেলা কার্যালয়ে বাজানো হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ।
গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী সরিষা হাটির মোড় এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের ভাঙা ও পরিত্যক্ত কার্যালয় থেকে ভাষণটি প্রচারিত হয়। পরে দলটির জেলার কয়েকজন নেতাকর্মী ভাষণ প্রচারের ভিডিও তাদের নিজ নিজ ফেসবুকে পোস্ট করেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক শফিকুর রহমান মামুনের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকেও ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের ভাঙা দলীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় ছোট্ট একটি হ্যান্ড মাইক থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বাজানো হচ্ছে।
শরীয়তপুরে মোমবাতি প্রজ্বালন
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে শরীয়তপুর জেলা সদরে মধ্যরাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুক্রবার দিবাগত রাতে জেলা সদরের একটি স্থানে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নেতাকর্মীরা মোমবাতি জ্বালিয়ে সমবেত হন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।
শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ৩ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও একটি ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। শরীয়তপুরের ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, সেবক লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দিতে দেখা যায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের। নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর একটি মালা পরিহিত ছবি রেখে এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে এসব স্লোগান দেন।
এদিকে সাত মার্চ উদ্যাপনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে মিছিল নিয়ে ফুল দিতে আসা চারজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে কলাবাগান থানা পুলিশ। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ৩০-৪০ জনের একটি মিছিল ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের দিক থেকে মিছিল নিয়ে আসছিল। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে পৌঁছানোর পর পুলিশের বাধায় তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এর মধ্য থেকে চারজনকে ধরে থানায় নিয়ে যায় কলাবাগান থানা পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন পুরুষ।
কলাবাগান থানার ওসি মো. ফজলে আশিক বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা হাতে ফুল নিয়ে মিছিল করতে করতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আসে। এসময় তাদের মধ্যে চারজনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে একজন পুরুষ ও তিনজন নারী রয়েছে। ‘এই চারজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
একাত্তরের যে দিনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের ঘোষণায় স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি প্রান্তে, ইতিহাসের বাঁক বদলে দেওয়া সেই ৭ মার্চ এবার এসেছে ভিন্ন বাস্তবতায়।
আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে ৭ মার্চ উদযাপনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে যে ছেদ পড়ছিল। শেখ হাসিনা প্রবল গণআন্দোলনের মুখে চব্বিশের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকে ইতিহাসে সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে আওয়ামী লীগ।
হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে প্রতিবছরই নানা কর্মসূচিতে পালিত হত জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দিনটি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
বদলে যাওয়া বাস্তবতায় ঐতিহাসিক এই দিনে কোনো কর্মসূচির কথা শোনা যায়নি। গত বছর মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির নেতাকর্মীরা হয় পলাতক, নয় তো জেলে।
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকাণ্ড ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ; ৭ মার্চ ঘিরেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
মগবাজারে পদযাত্রা, চানখাঁরপুলে দুজন আটক
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় ঢাকার চানখাঁরপুল মোড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীসহ দুজনকে আটক করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশ থেকে তাদের আটক করা হয়।
এদিনই দুপুরে মগবাজার এলাকায় ৭ মার্চের ভাষণ বাজিয়ে পদযাত্রা করেছেন চার তরুণ-তরুণী। তাদের একজন বলেছেন, পদযাত্রা নিয়ে তারা কোনো বাধার মুখে পড়েননি। চানখাঁরপুলে আটক আসিফ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাকে আটক করে পুলিশ। তার কিছুক্ষণ বাদে সেখান থেকে সাউন্ড বক্স জব্দ করে অপারেটরকে আটক করে নিয়ে আসে পুলিশ।
শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। তাই তাদের যে কোনো কার্যক্রমও নিষিদ্ধ।’
নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার নির্দেশ
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দলের ভার্চুয়াল বৈঠকে বিদেশে আশ্রিত নেতাদের দেশে ফিরতে মানসিক ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। শেখ হাসিনার এ হুকুম শুনে দলের নেতাদের একাংশের ধারণা, তিনি দলের কার্যক্রমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে হয়তো ইতিবাচক বার্তা পেয়ে থাকতে পারেন। ভার্চুয়াল বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা জানান, নেত্রীর কণ্ঠে পরিচিত আত্মবিশ্বাস ধরা পড়েছে। ২০২৪ সালের অগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় ১৮ মাস পর প্রথম বারের মতো তিনি দলের নেতাদের নির্দেশ দেন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে।
সূত্রের খবর, গত ২৪ ফেব্রুয়ারির ভার্চুয়াল বৈঠকে দেশের ভেতরে আত্মগোপনে ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আওয়ামি লিগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে চলতি মাসের ৭, ১৭ ও ২৬ মার্চে কর্মসূচি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনপরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকটি করেন শেখ হাসিনা। এসব কর্মসূচির পালনের মাধ্যমে তিনি আঁচ করতে চাইছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এ ৩টি ঐতিহাসিক দিবস পালনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বাধা দেয় কি না।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। ১৭ মার্চ তার জন্মদিন। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস।
আওয়ামী লীগের এমন উদ্যোগের খবরে কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসরে ফিরতে দিলে ভবিষ্যতে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আবার কারও কারও মতে, বহুদলীয় গণতন্ত্রে একটি বড় দলকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাখা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং এতে লাভবান হতে পারে তৃতীয় শক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য সমঝোতা না থাকলেও আওয়ামি লিগ ও বিএনপির মধ্যে একটি নীরব সমীকরণের আভাস মিলছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে আওয়ামি লিগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারিও মনে করেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত ও এনসিপি মেনে নেবে না। তার মতে, ফৌজদারি অপরাধের মতো ঘটনার জন্য আওয়ামি নেতাদের বিচার করতে হবে। তা-না হলে হঠাৎ যদি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কেকে/ এএম