আজ ৮ মার্চ। বিশ্ব নারী দিবস। বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যে অগ্রগতির কথা আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন। গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নারীর অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাকশিল্পে নারীর কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতি ও সমাজে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি এবং শ্রমবাজারে নারীর প্রবেশের সুযোগ, গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। এর ফলে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে নারীর অবদান দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু এ অগ্রগতির বিপরীতে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও ক্রমশ সামনে আসছে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বৃদ্ধি। বিশেষ করে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা আমাদের সমাজে গভীর নিরাপত্তাহীনতার বার্তা দিচ্ছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫১৬টি, যার মধ্যে শিশু ছিল ২৭০ জন। পরবর্তী বছরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮৬-এ, যার মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫৪৩টি। এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে নারী ও শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নরসিংদীসহ কয়েকটি এলাকায় ধর্ষণের বিচার দাবিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, কিশোরী হত্যা কিংবা নারী নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতাকেই সামনে আনেনি, বরং সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্নও তৈরি করেছে।
এ বাস্তবতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও বড় বাধা। যখন পরিবারগুলো মনে করে যে মেয়েদের বাইরে যাওয়া বা শিক্ষা গ্রহণ নিরাপদ নয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাল্যবিবাহ, স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর।
এর সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো নারীকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বা ভিকটিম ব্লেমিং। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ধর্ম, নৈতিকতা কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলার নামে নারীর চলাফেরা ও স্বাধীনতাকে সীমিত করার চেষ্টা করা হয়, যা বাস্তবে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই প্রতিফলন।
ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যবহার করে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাও সমাজে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। অথচ বিভিন্ন ইসলামী নারীবাদী চিন্তাবিদ দেখিয়েছেন যে ধর্ম নিজে নারীর অধিকারকে অস্বীকার করে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যাই ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর অবস্থানকে সীমিত করে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আইনের কার্যকর প্রয়োগ। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা নিয়ে কার্যকর পাঠ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারীর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই নারীকে নিরাপদ পরিবেশ না দিলে সেই অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে পিছিয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের যে পথ আমরা গড়ে তুলেছি, সেটিও টেকসই থাকবে না।
কেকে/ এমএস