প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত। কখনো কি ভেবে দেখেছি কেন এই ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো এবং এর উদ্দেশ্য কী?
আমরা জানি প্রাচীনকাল থেকেই নারীরা ছিল বঞ্চিত, অবহেলিত। নারীদের প্রাপ্য অধিকার পাওয়া তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাই দায়। শিক্ষা, চিকিৎসা, ন্যায্য মজুরি থেকে নারীদের বঞ্চিত করা হতো। নারীদের শুধু বঞ্চিতই নয় অকারণে নির্যাতন করা হতো। তাদের মতামতের ছিল না কোনো মূল্য, ছিল না ভোটাধিকার। মা, মেয়ে, বোন, স্ত্রী কোন সম্পর্কের দিক থেকেই তারা পেত না যথাযথ সম্মান।
১৯০৮ সালে সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারী দিবসের ভিত্তি তৈরি হয়। সে সময়ে নিউইয়র্কে কাজের সময় কমানো ও উন্নত বেতনের দাবিতে পোশাক শিল্পের প্রায় ১৫ হাজার নারী রাস্তায় নেমেছিল। এর আগে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা নিজেদের ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করে।
পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ নারীরা এবং ১৯২০ সালে মার্কিন নারীরা পূর্ণ ভোটাধিকার লাভ করে। অর্থাৎ তথাকথিত উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও নারীরা ছিল অবহেলিত। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত কর্মজীবী নারীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। সুদীর্ঘ ৬৫ বছর পর ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চ দিনটি উদযাপন করতে শুরু করে এবং ১৯৭৭ সালে একে সাধারণ পরিষদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
যুগে যুগে নারীরা লিঙ্গ সমতা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য যে সকল আন্দোলন করেছে এই ৮ মার্চ হলো সে সকল আন্দোলনের সফলতার প্রতীক।
৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো সমাজে নারীদের মর্যাদা সমুন্নত করা, সমাজের জন্য তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করানো।
কিন্তু এই উদ্দেশ্য আসলেই কি সফল হচ্ছে?
গত কয়েক দশকে নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আসলেও নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও প্রশ্নাতীত। নারী দিবস উদযাপনের ৫১ বছর পরেও প্রশ্ন ওঠে, আমাদের নারীরা আদৌ কি নিরাপদ?
উত্তর হলো, “না, নিরাপদ নয়।” নারীরা এখনও অবহেলিত, নির্যাতিত, বঞ্চিত।
প্রথমেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের কথা বলি- বাংলাদেশে ধর্ষণের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয় না, ধর্ষণের পর খুন! নারীরা শুধু অপরিচিত, বাড়ির বাইরের মানুষ বা গুন্ডা পান্ডাদের কাছেই যে ধর্ষিত হচ্ছে বিষয়টা এমন না। নিজ বাড়িতেও তারা ধর্ষিত হচ্ছে চাচা, মামা, নিকট আত্মীয়দের কাছে, এমনকি নিজের বাবার কাছে মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে।
মানুষরূপী এই পশুদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি দুই বছরের শিশু, রক্ষা পায় নি চলাচলে অক্ষম বৃদ্ধা। ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি হয়ে গেছে যা ক্যানসারের মতো ছড়াচ্ছে। ভুক্তভোগীরা পাচ্ছে না ন্যায় বিচার। বাড়ির বাইরে বের হলেই হতে হয় ইভটিজিং এর শিকার, বিভিন্ন পরিবহনে যেমন বাস, ট্রেনে যাতায়াতের নারীদের হেনস্তার শিকার হতে হয়। এসব যেন সমাজের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বাসে কখনো গায়ে পড়া, ওড়না টান দেয়া, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে স্পর্শ করা। বাসের ড্রাইভার ও হেল্পার মিলে বাসেই নারীকে ধর্ষণের ঘটনাও কম নয়। নারীদের বিভিন্নভাবে বুলিং করা হচ্ছে, তাদের কোন ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। সমাজে লজ্জিত হওয়ার ভয়ে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএ এর ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপ-
বাংলাদেশে প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন (৭৬%) তাদের জীবনে অন্তত একবার কোন না কোনভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে ২৫২৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮১টি ছিল ধর্ষণের। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১টি। বিবাহিত নারীদের প্রায় ৫৪% তাদের স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ৮.৩% নারী প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে ইমেজ-বেসড অ্যাবিউজ এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল।
শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বে আজও নারীরা ধর্ষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত। প্রাপ্য অধিকার আদায়ের জন্য করতে হয় সংগ্রাম। এমনকি যেই দেশগুলো লিঙ্গসমতার দাবি করে তারাও নারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এবং টঘ ডড়সবহ এর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি তিনজনে একজন নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। গত বারো মাসে বিশ্বের প্রায় ৩১৬ মিলিয়ন নারী ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন ১৩৭ জন নারী নিজ ঘরেই হত্যার শিকার হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও বিচারহীনতা এবং পুরুষ তান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীদের এই অনিরাপত্তা, ন্যায় বিচার না পাওয়ার জন্য দায়ী। অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে পার পেয়ে যাওয়া, নতুন অপরাধের পথ প্রশস্ত করে।এরকম আইনি ব্যবস্থায় অপরাধীদের মনে ভয়ের বদলে সাহস জোগায় এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে।
সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রে নারীকে স্বাধীন সত্তার বদলে পুরুষের অধীনস্থ বা ‘পণ্য’ হিসেবে দেখে। হয়রানির শিকার নারীকে উল্টো দোষারোপ করা (ঠরপঃরস ইষধসরহম), তার পোশাক বা চলাফেরাকে প্রশ্নের মুখে তোলা এসবই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যা অপরাধীর অপরাধকে আড়াল করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের সমাজে নারীবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি, তাৎক্ষণিক পুলিশি সহায়তার ঘাটতি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই নির্দেশ করে।
নারীদের ন্যায় বিচার করার জন্য বিচার বিভাগ হতে হবে নিরপেক্ষ। নারী অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি, নারীদের তাদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন, আইনের সহযোগিতা নিতে তারা যেন ভীত না হয় এই বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে।
নারী হেনস্তা রোধ করতে হবে। নারীর মর্যাদা শুরু হোক প্রতিটি পরিবার থেকে। তবেই সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেকে/ এমএস