উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কমে যাওয়ায় দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ডিমের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের উৎপাদক হয়েও তারা আজ নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বর্তমানে প্রতি ডিম উৎপাদনে যেখানে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে অনেক খামারিকে বাধ্য হয়ে সাড়ে ৬ টাকায় ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। টানা কয়েক মাস ধরে এই লোকসান বহন করতে গিয়ে অনেকেই সর্বস্ব হারানোর পথে। এ পরিস্থিতি শুধু একটি খাতের অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক খামারিদের শ্রম ও বিনিয়োগের ওপর ভর করেই দেশের পোল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠেছে। তাদের হাত ধরেই ডিম ও মুরগি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা সস্তা প্রোটিনের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। কিন্তু আজ সেই খামারিরাই নানামুখী সংকটে জর্জরিত।
উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, খাদ্য ও ওষুধের উচ্চমূল্য, রোগবালাই মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব—সব মিলিয়ে ছোট ও প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে অনেক খামারি ইতোমধ্যে খামার গুটিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ দারোয়ানের কাজ করছেন, কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার কেউ ঋণের চাপে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যারা এখনো খামার চালু রেখেছেন, তাদের অবস্থাও খুব অনিশ্চিত। প্রতিদিনের লোকসান সত্ত্বেও তারা খামার বন্ধ করতে পারছেন না, আবার চালিয়ে নেওয়াও ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে। এ বাস্তবতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হবে। একের পর এক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে গেলে পোল্ট্রি বাজারে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হতে পারে। তখন উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার সুযোগও বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর, কারণ তখন ডিম ও মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে বাজার ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রান্তিক খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এবং বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মুরগির খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালানো প্রয়োজন।
একইসঙ্গে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেবাকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে রোগবালাই বা অন্য সমস্যায় খামারিরা দ্রুত সহায়তা পান। পোল্ট্রি খাত শুধু একটি কৃষিভিত্তিক শিল্প নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা। তাই প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখা মানে শুধু কয়েকজন উদ্যোক্তাকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখা। এখন সময় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রান্তিক খামারিদের জন্য কার্যকর নীতি ও সহায়তা নিশ্চিত করার। তা না হলে এ সংকট আরও গভীর হবে এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহন করতে হবে দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তা সমাজকেই।
কেকে/এসএ