বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো থেকে শুরু করে মফস্বল এলাকা পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়। পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ২৩৭টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং রয়েছে, যার মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ১২৭টি গ্যাং তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ গ্যাংগুলোর সদস্য সংখ্যা ২,৩৭২ জনেরও বেশি এবং তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধমূলক মামলা রয়েছে।
কিশোর গ্যাংগুলো মূলত ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-তরুণদের নিয়ে গঠিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে ১৮ বছরের বেশি বয়সি সদস্যরা এর নেতৃত্বে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা দ্রুত পরিচিতি লাভ করে এবং নতুন সদস্যদের আকৃষ্ট করে।
কিশোর অপরাধের এ ভয়াবহ উত্থানের পেছনে বহুমুখী সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। পারিবারিক অস্থিরতা কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বর্তমানে একক পরিবারের বিস্তারের ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে। অভিভাবকরা কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারায় কিশোররা তাদের আবেগীয় শূন্যতা পূরণের জন্য বন্ধুদের বা গ্যাংয়ের আশ্রয় নেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে তদারকির অভাব এবং নৈতিক মূল্যবোধের সঠিক শিক্ষা না থাকায় কিশোররা খুব সহজেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়। স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করা এবং মিছিল-মিটিংয়ে জনবল বাড়ানোর জন্য তারা এ কিশোরদের ব্যবহার করে। তথাকথিত এ ‘বড় ভাই’রা কিশোরদের অস্ত্র সরবরাহ করে, পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা দেয় এবং অপরাধমূলক কাজের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করে। এ রাজনৈতিক ঢাল তাদের আরও বেপরোয়া অপরাধী হতে উদ্বুদ্ধ করে। অর্থনৈতিক সংকট কিশোর অপরাধের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। নিম্নবিত্ত পরিবারের কিশোররা এই পথে পা বাড়ায় বেশি। বেকারত্বের কারণে হতাশা থেকে এ অপরাধের দিকে ধাবিত হয় তারা।
বাংলাদেশে কিশোর অধিকার সুরক্ষা এবং বিচার ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘শিশু আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনানুযায়ী ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শিশুকে গ্রেপ্তারের পর হাতকড়া বা দড়ি ব্যবহার করা যাবে না এবং পুলিশের পক্ষ থেকে মানবিক আচরণ করতে হবে। প্রতিটি থানায় একজন ‘শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘প্রবেশন কর্মকর্তা’ থাকবে যারা শিশুর আইনি প্রক্রিয়া তদারকি করবেন। আইনগত ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগে রয়েছে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা। শিশুদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাদের বয়স নির্ধারণে ত্রুটি করে এবং সাধারণ অপরাধীদের মতো প্রাপ্তবয়স্কদের জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। জন্ম নিবন্ধনের নিম্ন হারের কারণে শিশুর সঠিক বয়স প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে পুলিশ ও বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব থাকায় বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রবেশন কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা কিশোরদের সংশোধনের পথকে আরও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশে অপরাধী কিশোরদের সংশোধনের জন্য তিনটি প্রধান কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গী (বালক), যশোরের পুলেরহাট (বালক) এবং গাজীপুরের কোনাবাড়ির (বালিকা) কেন্দ্রগুলো শিশুদের চরিত্র সংশোধন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করার কথা থাকলেও বর্তমানে এগুলো নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিশু অবস্থান করার ফলে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন ব্যাহত হয় এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া একই কেন্দ্রে খুনের আসামি এবং চুরির অভিযোগে আটক শিশুদের একত্রে রাখার কারণে ছোট অপরাধীরা বড় অপরাধীদের প্রভাবে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। বিদ্যমান কেন্দ্রগুলো সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠান হলেও জেলখানার মতো করে পরিচালিত হয়। তা ছাড়া পর্যাপ্ত সংখ্যক কাউন্সিলর, মনোবিজ্ঞানী বা সমাজকর্মীও নেই। কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী নয়। মুক্তি পাওয়ার পর সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ‘আফটারকেয়ার’ ব্যবস্থাও নেই। ফলে অনেক শিশু পুনরায় গ্যাং কালচারেই ফিরে যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিশোর অপরাধে শাস্তির পরিবর্তে পুনর্বাসনের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ দমনে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশ এ মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তার নিজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার করতে পারে। সিঙ্গাপুরে কিশোর অপরাধীদের জন্য ‘গাইডেন্স প্রোগ্রাম’ নামক একটি ৬ মাস মেয়াদি পুনর্বাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এতে পুলিশ সরাসরি মামলা না করে কিশোরকে এ প্রোগ্রামে পাঠায়। সেখানে স্কুল, পরিবার এবং সমাজসেবা সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করে কিশোরের ভুল সংশোধন করে। এ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুনরায় অপরাধ করার হার মাত্র ২ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা পুনরুদ্ধারমূলক বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখানে অপরাধী এবং ভিকটিমকে সামনাসামনি বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে অপরাধী নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং সামাজিকভাবে হেয় না হয়েই মূলধারায় ফিরতে পারে। জাপানের ‘কোবান’ সিস্টেম বা পাড়া-মহল্লায় ক্ষুদ্র পুলিশিং ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা মডেল। এখানে পুলিশ সদস্যরা এলাকার প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন এবং কিশোরদের আচরণ মনিটর করেন। বাংলাদেশের কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে এ ধাঁচে পুনর্গঠন করলে কিশোরগ্যাং গঠন প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কিশোর অপরাধীদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য কারিগরি শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে এবং বেশ কিছু নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘স্টেপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কিশোরকে ৩৮টি ভিন্ন ভিন্ন কারিগরি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা ইলেকট্রিশিয়ান, কার্পেন্টার বা অটোমোবাইল মেকানিক হিসেবে দক্ষ হয়ে উঠছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৩৪ শতাংশ সরাসরি কর্মসংস্থান পাচ্ছে। কিশোর অপরাধীদের এ ধরনের ভোকেশনাল ট্রেইনিং প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সংশোধনাগার পরবর্তী জীবনে স্বনির্ভরতা বাড়বে। উন্নত বিশ্বে কিশোর অপরাধীদের জন্য ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’ ব্যবহার করা হয়, যা তাদের নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং আগ্রাসন কমাতে সাহায্য করে । বাংলাদেশের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে পেশাদার থেরাপিস্ট নিয়োগ করা হলে কিশোরদের অপরাধ বিমুখ করা সহজ হবে ।
লেখক : চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
কেকে/এসএ