মেহেরপুর জেলায় এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে গমের আবাদ। ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাতের সম্প্রসারণে ব্লাস্ট রোগের আশঙ্কা কমলেও ন্যায্য দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিলেও বাজারদর নিয়ে তাদের উদ্বেগ কাটছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ব্যাপকভাবে গমের আবাদ বেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে গমের ভালো ফলনে কৃষকদের আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালের পর কয়েক বছর ব্লাস্ট রোগের কারণে জেলায় গম চাষে ভাটা পড়েছিল। পরে ২০১৭ সালে দেশের প্রথম ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত বারি গম-৩৩ উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ব্লাস্ট নামের ভয়ংকর ছত্রাকের আক্রমণে একসময় অনেক কৃষক মাঠের পর মাঠ গমক্ষেত পুড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হন। মেহেরপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আটটি জেলায় এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল।
পরে বারি গম-৩৩-এর পাশাপাশি ব্লাস্ট প্রতিরোধী আরেকটি জাত বিডব্লিউএমআরআরআই গম-৩ উদ্ভাবন করা হয়। উচ্চ ফলন, তাপ সহিষ্ণুতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভালো ফলন দেওয়ার সক্ষমতার কারণে এ দুটি জাত কৃষকদের আস্থা অর্জন করেছে।
তবে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন বাড়লেও দাম নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। গত বছর গম কাটার মৌসুম শুরু হলে প্রতি মণ গমের দাম ছিল ১২০০-১৪০০ টাকার মধ্যে।
মুজিবনগর উপজেলার গম চাষি আরজান আলী বলেন, ‘ভরা মৌসুমেই অধিকাংশ কৃষক গম বিক্রি করতে বাধ্য হন। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে পরবর্তী আবাদের খরচ জোগাতে হয় প্রান্তিক কৃষকদের। ফলে অনেকেই গম ঘরে তোলার আগেই বিক্রি করে দেন। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা কম দামে গম কিনে মজুত করেন। পরে কৃষকের ঘরে গম না থাকলে বাজারে দাম বেড়ে যায়। গত বছর শেষ দিকে গমের দাম ১৭০০ টাকা মণ পর্যন্ত উঠেছিল।’
কৃষকদের অভিযোগ, আগের তুলনায় গম চাষের খরচ বেড়েছে। সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের দাম বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিক সংকটের কারণে গম কাটা-মাড়াইয়ের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মৌসুমে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে রাসায়নিক সার কিনতে হয়েছে অনেক কৃষককে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাতের সম্প্রসারণের ফলে রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। তবে গত দুই বছরে এসব জাতের আবাদ কিছুটা কমেছে।
ব্লাস্ট প্রতিরোধে সময়মতো ছত্রাকনাশক স্প্রে এবং কার্তিক মাসের মধ্যে গমের বীজ বপনের পরামর্শ দিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।
এদিকে চলতি মৌসুমে দীর্ঘ সময় শীত থাকায় ভালো ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
ভোমরদহ গ্রামের গম চাষি মিলন হোসেন বলেন, ‘পরিবারের রুটির চাহিদা মেটানোর জন্যই এলাকার বেশিরভাগ কৃষক গম আবাদ করেন। বারি গম-৩৩ জিংকসমৃদ্ধ ও পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও অনেকের পছন্দ বারি গম-৩০ ও বারি গম-৩২। এ দুটি জাতের রুটি সাদা ও পাতলা হয় এবং খেতেও সুস্বাদু। তাই অনেক কৃষক ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাতের পরিবর্তে এসব জাতের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ১৩ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। এ বছর গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জিব মৃধা জানান, রবি মৌসুমে গম একটি জনপ্রিয় ফসল। খাদ্য চাহিদা পূরণ ও জমির ভৌগোলিক উপযোগিতার কারণে কৃষকরা গম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
তবে উৎপাদন খরচ বাড়ায় গমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কেকে/এমএস