বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অধিবেশন ছিল না বরং এটি ছিল দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সমীকরণের একটি বড় পরীক্ষা। নতুন সংসদের শুরুতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিরোধীদলের হৈচৈ, ওয়াকআউট, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সংসদ পরিচালনায় বিজ্ঞ সিনিয়র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করা—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দিনের শেষে সব আলোচনা ছাপিয়ে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক আচরণ। একদিকে সরকারদল বিএনপি জোট সংসদকে কার্যকর করার আপ্রান চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি জোট সংসদ ছেড়ে ওয়াকআউট করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। এই দুই ভিন্ন আচরণের মধ্যেই দিনের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথম অধিবেশনে প্রথম সংসদ সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভূমিকা প্রথম দিনেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দেশের আপামর সাধারণ জনগণ বিটিভিসহ সব ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অনলাইন চ্যানেলের মাধ্যমে দেখতে পেলো দিনভর তারেক রহমানের বক্তব্য। তার বক্তব্যে মূলত সংসদকে তিনি রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চ নয় বরং জাতীয় সমস্যা সমাধানের জায়গা হিসেবে দেখতে চান। তিনি সংসদে যুক্তি, উন্নয়ন আলোচনা এবং নীতিনির্ভর বিতর্কের গুরুত্বের কথা বলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে একদলীয় এবং একতরফা সংসদ ছিল, তারও অতীতে বর্জন বা সংঘাতের সংস্কৃতি দেখা গেছে, সেখানে আজকের প্রথম অধিবেশনের বার্তাটি নতুন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি সরকার পরিচালনার কৌশলের অংশ, যেখানে দলটি নিজেদেরকে শুধু বিরোধী আন্দোলনের দল নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মনোনীত প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার শান্ত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বে সংসদের প্রাথমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যায়। পরে সংসদ সদস্যদের ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একক প্রার্থী হিসেবে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বািচত হন। এই নির্বাচনগুলোকে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। কারণ সংসদের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের সামনে আনা হয়েছে, যাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যারা সংসদ পরিচালনায় ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবেন বলে ধারণা করা যায়।
তবে দিনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক এবং আলোচনার বিষয় ছিল বিরোধী জোটের ওয়াকআউট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ভাষন দেয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি জোট চরম হট্টগোল করে এবং পরবর্তীতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই জোটের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ কিন্তু একই রাষ্ট্রপতির নিকট শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অথচ এখন সংসদ ছেড়ে চলে গেলে এই জোটের আগের শপথ গ্রহণ এবং আজকের সেই প্রতিবাদের কার্যকারিতা কতটুকু থাকে?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ হলো বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে সরকারকে প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং যুক্তি তুলে ধরে বিকল্প মতামত দেওয়া—এসবই বিরোধী রাজনীতির মূল শক্তি। কিন্তু সেই জায়গাটি আজকের মত হৈচৈ হট্টগোল করে ছেড়ে দিলে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের অবস্থান অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই বিএনপি একটি কৌশলগত বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। তারা সংসদে উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রপতিকে সাপোর্ট করে গণতান্ত্রিক ধারা অক্ষুন্ন রাখতে এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এই মুহূর্তে বিএনপির এই সাংবিধানিক নীতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এদেশের বেশিরভাগ সাধারণ জনগণ চায় সংসদ চলুক, আলোচনা হোক, সমালোচনা হোক, বিতর্ক হোক, সিদ্ধান্ত হোক এবং দেশের উন্নয়ন নিয়ে নয় ছয় হলে জোড়ালো বিরোধিতা হোক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখার পর মানুষ এখন আর আগের ধারার সরকার কিংবা গৃহপালিত বিরোধী দল চায় না বরং জনগণের প্রত্যাশা কার্যকর রাজনীতি চলমান থাকুক।
বিএনপি যদি সংসদকে কার্যকর রাখার এই দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তাহলে তা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। আর জামায়াত এনসিপির জোটের দায়িত্ব হচ্ছে সংসদ স্থিতিশীল রাখা এবং গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করা।
রাজনীতিতে প্রতীকী ঘটনাও বড় বার্তা দেয়। সংসদের প্রথম দিনটি সেই অর্থে একটি প্রতীকী দিন ছিল। সরকারদল সংসদকে চালু রাখতে চেয়েছে, আর বিরোধী জোট শুরুতেই বাইরে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এতে রাজনৈতিকভাবে কে বেশি লাভবান হলো, তা খুব সহজেই বোঝা যায়। দায়িত্বশীল আচরণ এবং কৌশলী রাজনীতি অনেক সময় উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ক কতটা গঠনমূলক হয় এবং দেশের রাজনীতি কতটা পরিপক্ব পথে এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডীন—ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/এলএ