মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থনীতির ভেতরে জমে থাকা ঝুঁকিগুলোকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়া এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি খুবই বাস্তব। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়া এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়াবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। এর ওপর নতুন করে জ্বালানি সংকট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি অর্থনীতিকে আরেকটি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার যখন রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে, তখন ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়। এমন অবস্থায় আন্তর্জাতিক অস্থিরতা যুক্ত হলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আরও সতর্ক হয়ে পড়েন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিও উদ্বেগজনক। এডিপি বাস্তবায়নের হার দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। প্রকল্প প্রস্তুতির বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং সমন্বয়ের ঘাটতি দূর না করা গেলে অবকাঠামো উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে, যা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।
বৈদেশিক খাতে আপাতত কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও তা স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। রপ্তানি ও প্রবাস আয়ের প্রবাহ এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে রেমিট্যান্সের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বলতা তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো আগাম প্রস্তুতি। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার করে কর আদায়ের পরিধি বাড়াতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা জরুরি, যাতে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব পরিস্থিতি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নয়, কিন্তু সেই পরিস্থিতির ধাক্কা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া অবশ্যই সম্ভব। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ঢেউ দেশের অর্থনীতিকে আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
কেকে/ এমএস