| শিরোনাম: |

ফাইল ছবি
বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আর কেবল ব্যক্তিগত যোগাযোগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার সুবিশাল তথ্যভান্ডার বা ‘বিগ ডেটা’ এখন আমাদের সামনে এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের তৈরি ডেটা মূলত সমাজের সার্বিক প্রতিচ্ছবি প্রতিফলনের এক স্বচ্ছ আয়নায় পরিণত হয়েছে। এই বিগ ডেটার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এখন খুব সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারি, দেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলিকে কীভাবে দেখছে, দলগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, রাষ্ট্র বা দল পরিচালনায় কোনো প্রতিবন্ধকতা বা অসুবিধা আছে কিনা। সর্বোপরি জনমতের ট্রেন্ড বা গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে।
যা হোক, জনমত বোঝার আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্লেষণে আমরা যে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছি, তা প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়; বরং এটি বহুল প্রচলিত এবং একে বলা হয় ‘সোশ্যাল মিডিয়া এনালিটিক্স টুল’ বা সোশ্যাল এনালিটিক্স সিস্টেমস। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সোশ্যাল মিডিয়া এনালিটিক্স হলো— এমন একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, ব্র্যান্ড বা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক আলোচনা, মন্তব্য এবং মনোভাব ট্র্যাক করা হয় এবং তা বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি বা নতুন তথ্য বের করে আনা যায়।
আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং চ্যানেলের মাধ্যমে চিনে থাকি, যেমন— ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, লিংকডইন, এক্স, রেডিট এবং আরও অনেক কিছু। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স স্বতন্ত্র চ্যানেলগুলো থেকে সংগৃহীত লাইক, ফলো, রিটুইট, প্রিভিউ, ক্লিক এবং ইমপ্রেশনের মতো মেট্রিক্সের চেয়েও বিস্তৃত। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স বিশেষভাবে ডিজাইন করা সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, যা ওয়েব সার্চ টুলের মতোই কাজ করে। বিভিন্ন চ্যানেল জুড়ে থাকা সার্চ কোয়েরি বা ওয়েব ‘ক্রলার’-এর মাধ্যমে কিওয়ার্ড বা টপিক সম্পর্কে ডেটা পুনরুদ্ধার করা হয়। এরপর টেক্সটের অংশগুলো ফিরিয়ে এনে একটি ডেটাবেসে লোড করা হয়, এবং অর্থবহ ইনসাইট (অন্তর্দৃষ্টি) বের করার জন্য সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করা হয়। কার্যকর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সে টপিক বা কিওয়ার্ডগুলো নির্বাচন করা যেতে পারে এবং তারিখের সীমার মতো প্যারামিটার বা স্থিতিমাপগুলো সেট করা যেতে পারে। সোর্সগুলোও নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন— যেমন ইউটিউব ভিডিওর প্রতিক্রিয়া, ফেসবুকের কথোপকথন, টুইটারের যুক্তি-তর্ক বা নিউজ সাইটগুলোর মন্তব্য। একটি নির্দিষ্ট সেবা বা সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সোর্সগুলো নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত লক্ষ্য, বিষয়, প্যারামিটার এবং সোর্সগুলোকে সমর্থন করার জন্য একটি ডেটা সেট তৈরি করা হবে। ডেটা উদ্ধার, বিশ্লেষণ এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে রিপোর্ট করা হয়, যা একে বুঝতে এবং কাজে লাগাতে সহজ করে তোলে। এই ধাপগুলো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স পদ্ধতির একটি সাধারণ বিষয়, যা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সের সক্ষমতাগুলোর দ্বারা আরও কার্যকর করা যেতে পারে, যার মূলে রয়েছে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি।
সোশ্যাল মিডিয়া এনালিটিক্সের একটি অন্যতম বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া হলো সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস। এটি সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের মন্তব্যের সুর এবং উদ্দেশ্য পরিমাপ করে। এটি সাধারণত ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং প্রযুক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে, যাতে ইতিবাচক, নেতিবাচক, নিরপেক্ষ বা দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করার জন্য সম্পর্কগুলো বুঝতে সাহায্য করে। চার্ট, গ্রাফ, টেবিল এবং অন্যান্য প্রেজেন্টেশন টুলের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সের ফলগুলোকে সংক্ষিপ্ত আকারে শেয়ার করা হয়, যা কী বিশ্লেষণ করা হয়েছে তা প্রকাশ করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য সক্ষমতা প্রদান করে। এগুলো ব্যবহারকারীদের উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়াই দ্রুত অর্থ এবং ভিতরের খবর বুঝতে এবং নির্দিষ্ট ফলাফলগুলোর গভীরে তাকাতে সক্ষম করে। যেমন, নিচের চিত্রে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত মতামতের ওপর ভিত্তি করে সেন্টিমেন্ট এনালাইসিস দেখানো হলো।
চিত্র : বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত মতামতের উপর ভিত্তি করে সেন্টিমেন্ট এনালাইসিসের তথ্যচিত্র
যাহোক, গত লেখায় আমি সোশ্যাল মিডিয়া ডেটা বিশ্লেষণ করে বলেছিলাম যে, কোন কোন টপিকে এবং সিদ্ধান্তে বিএনপি নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের পরে এবং সরকার গঠনের পরে জনগণ পক্ষে, বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। অত্র লেখায় আমি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ডাটার ওয়ার্ড ক্লাউড এনালাইসিস এবং টপিক এনালাইসিস নিয়ে কথা বলেছি। এই লেখায় আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনগণের প্রকাশিত মতামতের সেন্টিমেন্ট এনালাইসিস নিয়ে কথা বলবো। এই সেন্টিমেন্ট এনালাইসিস পদ্ধতিটা তৈরি করতে আমি পজিটিভিস্ট প্যারাডাইম ব্যবহার করছি এবং সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত ডেটাগুলোকে পূর্বের লেখার মতো তিন ভাগে ভাগ করেছি— নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের পরে এবং সরকার গঠনের (১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের সরকার গঠন) পরে।
১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের সরকার গঠনের পর থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত আমরা ডেটা সংগ্রহ করছি। সেই ডেটা থেকে আমরা সম্পূর্ণ বা কমপ্লিট এবং মানসম্পন্ন কমেন্টগুলো গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি যে এই ডেটাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ডেটার মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষের মনোভাব বিশ্লেষণ করতে পারি এবং এই ডেটায় আমরা নতুন যে সংযোজনটি নিয়ে এসেছি সেটা হলো লোকেশন বা অবস্থান ডেটা। লোকেশন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য বলতে আমরা বোঝাচ্ছি কমেন্টগুলো দেশের কোন অঞ্চল, জেলা বা বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে। এই লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে দেশের কোন অঞ্চল থেকে মানুষ পজিটিভ বা নেগেটিভ মতামত প্রকাশ করছে, অথবা বিএনপির সরকারের পক্ষে, বিপক্ষে বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংস্কারমূলক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছে, তা বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
উপরের স্থিরচিত্রে আপনি দেখতে পাচ্ছেন চার রঙের বাবল বা বুদবুদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বাংলাদেশের এই মানচিত্রটিতে থাকা রঙিন বুদবুদগুলো— সবুজ (ইতিবাচক), হলুদ (নিরপেক্ষ), লাল (নেতিবাচক), এবং কমলা (ব্যঙ্গাত্মক নেতিবাচক) একটি বিস্ময়কর বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। আমার তৈরি এই সিস্টেমটা সরকারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত আছেন, এমন যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন। এটি ব্যবহার করে তারা অনেক ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। তারা সারাদেশের একটি পরিপূর্ণ চিত্র পাবেন— যার মাধ্যমে জনগণের সরকারের প্রতি ইতিবাচক ধারণা, নেতিবাচক ধারণা এবং তারা যদি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে চান, তাহলে নির্দিষ্ট কমেন্টও তারা বের করে দেখতে পারবেন।
এই এনালাইসিস সিস্টেমটা সরকারি পর্যায়ে যারা নীতি-নির্ধারক আছেন, তাদের উপকার করবে বলে আমার বিশ্বাস এবং আমরা মনে করি যে এটা দেশের জন্য একটি আয়নার মতো কাজ করবে। মানুষের ধারণা বা সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে জানার এবং কোন অঞ্চলের মানুষ কোন ধরনের সেন্টিমেন্টের মধ্যে বর্তমানে আছে, যা কিনা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল— তার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং এনালাইসিস এই সিস্টেমটির মাধ্যমে করা সম্ভব। এই সিস্টেমের মাধ্যমে যদি আমরা একটি অঞ্চলের জনগণের ভালো লাগার এবং খারাপ লাগার বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারি বা স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ঠিক কী অনুভব করছে তা নিখুঁতভাবে বুঝতে পারি, তাহলে সেগুলো সরকারের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে সাহায্য করবে।
আঞ্চলিক ডেটার দিকে তাকালে জনগণের মানসিক প্রতিক্রিয়ার সঠিক গঠনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা প্রত্যাশিতভাবেই সমালোচনামূলক রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান চালিকাশক্তি। এই বিশাল কেন্দ্রীয় ক্লাস্টারে নেতিবাচক (লাল : ৪,৭৫৫) এবং ব্যঙ্গাত্মক নেতিবাচক (কমলা : ৪,৫৩৫) মন্তব্যগুলো আলোচনার বিশাল অংশ দখল করে আছে। ইতিবাচক (সবুজ : ২,১৫৫) এবং নিরপেক্ষ (হলুদ : ১,৩৯০) অনুভূতিগুলো উপস্থিত থাকলেও সমালোচনার বিপুল পরিমাণের কাছে তা অনেকটাই ম্লান। চট্টগ্রাম (দক্ষিণ-পূর্ব) বন্দর নগরী একটি চমকপ্রদ প্রবণতা প্রকাশ করে, যেখানে ব্যঙ্গাত্মক নেতিবাচক (কমলা : ১,৭৯৫) মন্তব্যগুলো আসলে সাধারণ নেতিবাচক (লাল : ১,৩৪০) মন্তব্যকে ছাড়িয়ে গেছে। ইতিবাচক (৫৯৫) এবং নিরপেক্ষ (২৯০) অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিএনপির মিডিয়া সেল অথবা তথ্য মন্ত্রণালয় এইসব নেতিবাচক (লাল : ৪,৭৫৫) আলোচনার প্রধান চালিকাশক্তি বের করার কাজে হাত দিতে পারে, যা থেকে অনেক নতুন অজানা বিষয় সামনে আসতে পারে।
জনগণ যখন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ ব্যর্থ হয়। মানচিত্রটিকে কমলা এবং লাল থেকে পুনরায় অধিক সবুজে ফিরিয়ে আনতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে দেশের সচেতন জনগণ পরিবর্তন এবং দৃশ্যমান বা স্বচ্ছ কাজের দাবি জানাচ্ছে, এবং তারা অত্যন্ত সমালোচনামূলক, ক্ষমাহীন ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে। এলাকা-ভিত্তিক এসব বিষয়ে জানা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি মনে করি এআই এবং সোশ্যাল মিডিয়া এনালিটিক্সের মাধ্যমে মানুষের মতামত বা জনমত পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করার এই পদ্ধতি কেবল সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনার গুড গভর্ন্যান্সের জন্যই প্রয়োজনীয় নয়; বরং রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন প্রশাসনিক দিক, প্রশিক্ষণ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর এই মনিটরিং ব্যবস্থা আগামী দিনে নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ও সরকারকে নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে জনবান্ধব ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে আরও বেশি সহায়তা করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ধন্যবাদ।
লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহির্বিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।
কেকে/এলএ