বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপের পর তাদের কৌশলগত নজর কি অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে? আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় এখন দুটি দেশের নাম তুলনামূলক বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, দেশ দুটি পাকিস্তান এবং মিয়ানমার। ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় তাদের ভূমিকা একেবারে ভিন্ন হলেও এই দুই দেশই এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক জটিল সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এই বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলমান। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই উত্তেজনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাতের এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক পরিসরে আরেকটি প্রশ্নও উত্থাপন করেছে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারিত হয়, তাহলে পরবর্তী কৌশলগত লক্ষ্য কোথায় হতে পারে? বিশেষ করে পাকিস্তানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা একেবারে অমূলক নয়। পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একমাত্র দেশ, যার হাতে কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার রয়েছে। এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিশেষ প্রতীকী অর্থ বহন করে এসেছে। অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক প্রায়ই পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘ইসলামিক বোমা’ বলে অভিহিত করেন। যদিও একই ধরনের অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা ফ্রান্সের হাতে থাকলে তা কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয় না। এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি পরিচিত বাস্তবতা।
ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকেও পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা একটি কৌশলগত বিবেচনার বিষয়। যদিও ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ পরস্পরের কাছাকাছি নয় এবং তাদের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের বাস্তব সম্ভাবনা সীমিত, তবুও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে পাকিস্তানকে অনেক সময় সম্ভাব্য একটি উপাদান হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের কোনো সম্ভাব্য সামরিক বা রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের মধ্যেই রয়েছে।
এখানে ভারত ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্কও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এই সহযোগিতা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং তা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা এবং একাধিক যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তোলে। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি দুই দেশের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়েছে, তবুও কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেমে নেই। বরং সামরিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক জোটের প্রশ্নে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে।
তবে পাকিস্তানকে সরাসরি কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা বাস্তবসম্মত কি না, সে প্রশ্নে অনেক বিশ্লেষকই সতর্ক। কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এ ধরনের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলবে। ফলে ইসলামাবাদের ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক ভারসাম্য বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলই বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সেখানে সংঘাতের মূল কারণ একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গৃহযুদ্ধ কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্মিত চীনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এই বন্দর চীনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত গড়ে ওঠা পাইপলাইন ও অবকাঠামো সংযোগ বেইজিংকে একটি বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডর ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে।
চীনের জন্য এই প্রকল্পের তাৎপর্য বোঝার জন্য ‘মালাক্কা দ্বিধা’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে চীনের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি এবং বাণিজ্যিক পণ্য দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে আসে। কিন্তু এই প্রণালি এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাব রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের সময় এই করিডর বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন করে রেখেছে।
কিয়াকফিউ বন্দর সেই উদ্বেগের একটি কৌশলগত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে সরাসরি চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে মালাক্কা প্রণালিকে এড়িয়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়, বরং ভারত মহাসাগরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতি শক্তিশালী করার একটি সম্ভাব্য ভিত্তি।
এ বাস্তবতাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব যত বাড়বে, ততই আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে।
মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া ব্রেভ বার্মা অ্যাক্টকে অনেক বিশ্লেষক কেবল নিষেধাজ্ঞা আইন হিসেবে দেখছেন না। তাদের মতে, এটি মিয়ানমারের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনার একটি কৌশলগত উদ্যোগ। এই আইনের আওতায় মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান আয়ের উৎস, তেল, গ্যাস এবং খনিজ খাতকে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জান্তাবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহায়তার পথও এতে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য হলো মিয়ানমারকে চীনের কৌশলগত করিডর হিসেবে পুরোপুরি কার্যকর হতে না দেওয়া। যদি চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প অস্থিরতার মধ্যে পড়ে, তাহলে তা বেইজিংয়ের বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগঠনটি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং রাখাইনের বড় অংশে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। কিয়াকফিউ বন্দর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ এখনো অব্যাহত।
ফলে মিয়ানমারের সংঘাত এখন কেবল একটি গৃহযুদ্ধের সীমায় আবদ্ধ নয়। বরং তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে আসে, ইরানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত নজর কি পাকিস্তানের দিকে, নাকি মিয়ানমারের দিকে?
বাস্তবতা হলো, এই দুই দেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব একেবারেই ভিন্ন ধরনের। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন পারমাণবিক শক্তি, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতি। অন্যদিকে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বিষয় হলো, দুষ্প্রাপ্য খনিজ (১৭টি ধাতব পদার্থকে দুষ্প্রাপ্য খনিজ বলা হয়) সম্পদের ভাণ্ডার। আধুনিকতম সমরাস্ত্র থেকে স্মার্টফোন তৈরিতে লাগে সেগুলি। বর্তমানে এই খনিজের ৯০-৯৫ শতাংশ রয়েছে চীনের নিয়ন্ত্রণে। তারা প্রায় ৭০ শতাংশের মতো এই খনিজ নিয়ে আসে মিয়ানমার থেকে। এরপর কৌশলগত করিডর, সামুদ্রিক বন্দর এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা।
তাই আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে ‘পরবর্তী লক্ষ্য’ ধারণাটি সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ, অবকাঠামোগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক জোট গঠনের মাধ্যমেও শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিচালিত হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মিয়ানমার ইতোমধ্যেই বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর পাকিস্তানকে ঘিরে উদ্বেগের মূল কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সখ্য, যা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোচনায় বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা তাই একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, কৌশলগত করিডর ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রে উঠে আসছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ইরান, পাকিস্তান বা মিয়ানমারের প্রশ্ন আসলে বৃহত্তর এক বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে বিশ্ব রাজনীতি ধীরে ধীরে নতুন এক অনিশ্চিত ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে। আর সেই বাস্তবতায় আগামী দিনে কোন অঞ্চল নতুন সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
কেকে/এলএ